ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতপার্থক্য বিশেষভাবে আলোচনায় আসে, যেখানে ‘একাত্তর কার্ড’ ছিল অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। জুলাই সনদ, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা, জুলাই অভ্যুত্থান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জ্বালানি সংকট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসহ নানা ইস্যুতে পুরো অধিবেশনজুড়ে তীব্র বিতর্ক দেখা যায়। এসব প্রশ্নে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে একাধিকবার বাকবিতণ্ডা ও ওয়াকআউটে জড়ায়। সব মিলিয়ে, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সংসদের এই অধিবেশন ছিল প্রাণবন্ত ও আলোচিত।
ফ্যাসিবাদমুক্ত সংসদ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনে ফ্যাসিবাদী ভাষ্য ও পুরোনো রাজনৈতিক বয়ানের প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ করে ‘রাজাকার’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ শব্দগুলোর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, যদিও আগের মতো বিএনপি-জামায়াতকে একসঙ্গে লক্ষ্য না করে এবার মূলত জামায়াতে ইসলামীর দিকেই এসব অভিযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল। এভাবে অতীতের বিভাজনমূলক রাজনীতি নতুন করে সামনে আনা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, যা তাদের মতে দুঃখজনক।
গত ১২ মার্চ শুরু হয়ে ৩০ এপ্রিল শেষ হওয়া এই অধিবেশন মোট ২৫ কার্যদিবস স্থায়ী হয়। সিনিয়র সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে পরে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব নেন। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯১টি বিল আকারে পাস হয় এবং অন্যান্য বিলসহ মোট ৯৪টি বিল গৃহীত হয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়, যেখানে ২৮০ জন সদস্য অংশ নেন।
বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনসহ মোট চার দফা ওয়াকআউট করে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান না করা, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল সংশোধন—এসব ইস্যুতে তারা প্রতিবাদ জানায়। তবে ওয়াকআউট করলেও পরে অধিবেশনে ফিরে আসে।
এ অধিবেশনের বড় বিতর্কের কেন্দ্র ছিল একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা। সরকারি দল বিরোধী পক্ষকে চাপে ফেলতে স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকা বারবার তুলে ধরে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল পাসের সময় এ প্রসঙ্গ আরও জোরালো হয়। অন্যদিকে জামায়াতের সদস্যরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে পাল্টা বক্তব্য দেন। এ নিয়ে সংসদে কয়েক দফা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
সংসদে এনসিপির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সক্রিয় ভূমিকার জন্য আলোচনায় আসেন। প্রশ্নোত্তর, পয়েন্ট অব অর্ডার এবং বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়মিত অংশ নিয়ে তিনি বিরোধী পক্ষের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম শেষ দিনের বক্তব্যে রাষ্ট্রপতির সমালোচনা করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন এবং তার বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
তবে তীব্র মতবিরোধের মধ্যেও সংসদের শেষ পর্যায়ে কিছুটা সহনশীলতার চিত্র দেখা যায়। সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ইঙ্গিত ছিল, এবং বিরোধী দলের উত্থাপিত কিছু সমস্যার সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অধিবেশনটি ছিল প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক, যদিও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে সমঝোতার অভাব ছিল। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের মতো পুরোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিভাজনমূলক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি নতুন বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক নয়।







