এক সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিদ্যুতের দাবিতে স্লোগান দিতেন, আর কোনো দাবি নাই, ভোলার মতো বিদ্যুৎ চাই’। কিন্তু এক যুগেরও বেশি সময় পর সেই ভোলাই এখন বিদ্যুৎ সংকটে জর্জরিত। ঘন ঘন লোডশেডিং, অনিশ্চিত সরবরাহ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক জটিলতা, অবহেলা এবং প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ভোলার নিজস্ব গ্যাস ব্যবহার করে পরিচালিত ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টটি ২০০৯ সালে চালু হয়েছিল। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসে পরিচালিত এ কেন্দ্র থেকে ইউনিটপ্রতি মাত্র ২ থেকে ২ দশমিক ৫ টাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো। অথচ দেশের অনেক তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি ১০ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত।
তবে যান্ত্রিক ত্রুটি ও চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটি ২০২৫ সালের জুনে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রটির টারবাইন বিকল হওয়ায় পুনরায় চালু করতে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার প্রয়োজন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় ২০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ভোলা গ্রিড সাবস্টেশন প্রকল্পও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা এলাকায় জমি অধিগ্রহণসহ প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হলেও অর্থসংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি থমকে আছে। ফলে জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনও অনেকাংশে নির্ভর করছে বোরহানউদ্দিনের ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কেন্দ্রের দুটি ট্রান্সফরমারের মধ্যে একটি ২০২২ সাল থেকে বিকল। ফলে একটি ট্রান্সফরমার দিয়েই পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে। অতিরিক্ত লোডের কারণে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং গ্রাহকদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সমস্যা আরও বাড়িয়েছে সঞ্চালন লাইনের পাশে অপরিকল্পিতভাবে লাগানো হাজারো গাছ। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই গাছ ভেঙে লাইনের ওপর পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আইনগত জটিলতার কারণে এসব গাছ অপসারণেও বিলম্ব হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভোলায় প্রায় ১ হাজার ৪৩৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত রয়েছে এবং এখান থেকে কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও জেলার মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না।
ওজোপাডিকোর ভোলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ বলেন, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে তিনটি উদ্যোগ জরুরি—৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করা, ভোলা গ্রিড সাবস্টেশন দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সঞ্চালন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন।
ভোলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা হওয়া সত্ত্বেও ভোলাবাসী যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পায়, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু এবং গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণের দাবি জানান।
জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু এবং গ্রিড সাবস্টেশন বাস্তবায়নের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হবে এবং গ্যাসসমৃদ্ধ ভোলার মানুষকে দীর্ঘদিন অন্ধকারেই থাকতে হবে।







