পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচনে পরাজয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলটির এই দ্রুত ভাঙনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি, বিজেপির সক্রিয় ভূমিকা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে অসন্তোষ।
নির্বাচনের পর তৃণমূল কার্যত তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল বিধায়ক নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে আলাদা ব্লক গঠন করেছেন। অন্যদিকে, তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত একদল লোকসভা সদস্য নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়ে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে গড়ে উঠেছে পৃথক একটি শিবির, যাকে অনেকেই ‘কালীঘাট তৃণমূল’ নামে উল্লেখ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল দলটির নির্বাচন-সর্বস্ব রাজনীতি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচনে জয়লাভ করা এবং ক্ষমতায় থাকা। কিন্তু শক্তিশালী কোনো আদর্শিক ভিত্তি বা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দর্শন গড়ে না ওঠায় নির্বাচনে পরাজয়ের পর অনেক নেতাকর্মী নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, বিজেপি এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে। নির্বাচনে জয়ের পর দুর্বল অবস্থায় থাকা তৃণমূলে বিভক্তি তৈরির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতিকে নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছে দলটি। বিদ্রোহী বিধায়ক ও সাংসদদের পেছনে বিজেপির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনের অভিযোগও উঠেছে।
এছাড়া দলের অভ্যন্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভও প্রকাশ্যে এসেছে। বিদ্রোহী নেতাদের অভিযোগ, অভিষেকের নেতৃত্বে দল পরিচালনায় কেন্দ্রীকরণ বেড়েছে এবং তৃণমূলের ঐতিহ্যগত জনভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কর্পোরেট ধাঁচের ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনি পরামর্শক সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত পরিসরের নেতাদের প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
দলের একাংশের দাবি, তৃণমূলের পুরোনো নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে নির্বাচনে পরাজয়ের পর সেই অসন্তোষ দ্রুত বিস্ফোরণের রূপ নেয় এবং দলীয় ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট শুধু একটি নির্বাচনি পরাজয়ের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং আদর্শিক শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ। আগামী দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবেন, সেটিই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।







