বঙ্গোপসাগরে পুনরায় সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কমোডর ওমর ফারুক জানিয়েছেন, চীনের তৈরি নতুন হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন বহরে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে কার্যকর উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে পাকিস্তান নৌবাহিনী।
সম্প্রতি চীনে নির্মিত ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ সাবমেরিন আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাবমেরিনটি পাকিস্তানে নিয়ে আসার দায়িত্বে ছিলেন কমোডর ওমর ফারুক। ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে অবস্থানকালে দেশটির সংবাদপত্র দ্য মর্নিংকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান।
সাক্ষাৎকারে কমোডর ফারুক বলেন, হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন পাকিস্তানকে বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তিনি জানান, বর্তমানে বহরে যুক্ত হওয়া পিএনএস হ্যাঙ্গরের পাশাপাশি একই শ্রেণির আরও সাতটি সাবমেরিন পর্যায়ক্রমে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সাবমেরিনগুলো পাকিস্তানের সামুদ্রিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং বঙ্গোপসাগরসহ বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দেশটির কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করবে। তিনি পিএনএস হ্যাঙ্গরকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের আগে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর উপস্থিতি ছিল। সে সময় পাকিস্তানের একটি সাবমেরিনের নামও ছিল পিএনএস হ্যাঙ্গর। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের নৌ তৎপরতা মূলত আরব সাগর ও তার আশপাশের অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সাবমেরিন সংগ্রহ এবং বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা পাকিস্তানের সামুদ্রিক কৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগর বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাসহ একাধিক দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে এ অঞ্চলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই জলসীমায় যেকোনো নতুন সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে।
ভারত ঐতিহ্যগতভাবে বঙ্গোপসাগরে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে আসছে। বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নৌ কমান্ড এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান দেশটিকে এই অঞ্চলে শক্তিশালী সামুদ্রিক উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রেও বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের বড় অংশই আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর নির্দিষ্ট অধিকার ভোগ করলেও আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিদেশি সামরিক জাহাজ ও সাবমেরিনের চলাচলে সাধারণত কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন কর্মসূচি শুধু সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উদ্যোগের অংশ। এর ফলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।







