ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে আমরা প্রধান চার ইমামের একজন এবং ফিকাহ শাস্ত্রের অনন্য পন্ডিত হিসেবেই চিনি। তবে এর পাশাপাশি তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন কাপড় ও টেক্সটাইল খাতের একজন সফল উদ্যোক্তা এবং কাপড়ের বড় ব্যবসায়ী। একই সাথে ব্যবসা পরিচালনা করা এবং ফিকাহর মতো জটিল শাস্ত্রের চর্চা করা খুব সহজ ছিল না, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন।
আজকের পুঁজিবাদী যুগে আমরা পণ্যের মার্কেটিং বা বিজ্ঞাপন করি মূলত পণ্যের অতি-প্রশংসা করে। “আমার পণ্যই সেরা”, “এই দামে বাজারে আর কোথাও পাবেন না”, “সীমিত সময়ের অফার” বা “বিশাল ডিসকাউন্ট”—এসবই হচ্ছে বর্তমান বিজ্ঞাপনের ভাষা। যেন ক্রেতাকে যেকোনো উপায়ে আকৃষ্ট করে নিজের পণ্যটি গছিয়ে দেওয়াই আধুনিক মার্কেটিংয়ের মূল লক্ষ্য।
কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ব্যবসার মার্কেটিং ও বিক্রয় নীতি ছিল আজকের যুগের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি কখনই পণ্যের অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে পণ্য বিক্রি করতেন না। বর্ণিত আছে, একবার তাঁর এক কর্মচারী বা ছেলে এক কাস্টমারের নিকট একটি কাপড়ের অতিরিক্ত প্রশংসা করায়, তিনি সেই পণ্যটি আর বিক্রিই করেননি।
ব্যবসায়িক সততা কেমন হওয়া উচিত, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। তিনি ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের প্রতিই ছিলেন চরমভাবে ইনসাফপন্থী। একবার এক নারী তাঁর কাছে কিছু কাপড় বিক্রি করতে এসে মাত্র ১০০ দিরহাম দাম চাইলেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কাপড়টি দেখেই বুঝলেন এর মূল্য আরও বেশি। তিনি অন্য এক ব্যবসায়ীকে ডেকে কাপড়টির প্রকৃত দাম যাচাই করলেন এবং শেষ পর্যন্ত ৫০০ দিরহাম দিয়ে কাপড়টি কিনে সেই পুরো টাকাটাই ওই নারীকে বুঝিয়ে দিলেন।
আধুনিক ব্যবসায় একটি বহুল প্রচলিত নিয়ম আছে—”বায়ার বিওয়্যার” ($Buyer\ Beware$), অর্থাৎ ক্রেতা নিজের দায়িত্বে পণ্য যাচাই-বাছাই করে কিনবেন, ঠকে গেলে বিক্রেতার দায় নেই। কিন্তু ইমামে আযমের নীতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। পণ্যের কোনো ত্রুটি বা খুঁত থাকলে তা ক্রেতার সামনে সবার আগে স্পষ্ট করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর।
একবার তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারকে তিনি একটি কাপড়ের সুনির্দিষ্ট খুঁতের কথা বলে দিয়েছিলেন, যাতে বিক্রির সময় ক্রেতাকে তা অবশ্যই জানানো হয়। কিন্তু তাঁর পার্টনার বিক্রির সময় সেটি বলতে ভুলে যান। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বিষয়টি জানতে পেরে সেই ক্রেতাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু তাঁকে না পেয়ে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পার্টনারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং ওই দিনের উপার্জিত ৩০,০০০ দিরহামের পুরোটাই গরিবদের মাঝে দান করে দেন।
তিনি কতটা উচ্চ পর্যায়ের তাকওয়াবান ছিলেন, তা তাঁর জীবনের আরেকটি ঘটনা থেকে বোঝা যায়। তাঁর এলাকায় একবার একটি ছাগলের বাচ্চা চুরির সংবাদ পাওয়ার পর, তিনি প্রায় সাত বছর কোনো ছাগলের মাংস খাননি। তিনি হিসাব করে দেখেছিলেন, একটি ছাগল সর্বোচ্চ কত বছর বাঁচতে পারে। যতদিন না ওই চোরাই ছাগলটি স্বাভাবিক মৃত্যুর বয়সে পৌঁছায়, ততদিন তিনি সন্দেহযুক্ত মাংস খাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন।
আজকের আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়ায় কেউ যদি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর এই বিপণন নীতি বা মার্কেটিং পলিসি প্রয়োগ করতে চায়, তবে অনেকেই তাকে অবাস্তব বা পাগল ভাববে। কিন্তু এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনবোধের তফাত।
পুঁজিবাদ যেখানে মনে করে, পণ্যের অতি-প্রচার এবং চতুরতাই ব্যবসার মুনাফা বাড়ায়, সেখানে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানুষের রিজিক বা উপার্জন মহান আল্লাহ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত। জীবনকে দেখার এই আলাদা বিশ্বাসের কারণেই আচরণের এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) প্রমাণ করে গেছেন যে, ব্যবসায় নিজের সততা, চারিত্রিক মাধুর্য এবং পরকালের জবাবদিহিতাই হলো ব্যবসার সবচেয়ে বড় এবং স্থায়ী মার্কেটিং।







