ইউরোপের রাজনীতিতে ইসলাম দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নতুন প্রজন্মের মুসলিম ফুটবলাররা দেখিয়ে দিচ্ছেন, ইসলাম এখন ইউরোপীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বাস করেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে বিশ্বকাপে মুসলিম খেলোয়াড়দের ধর্মীয় অনুশীলন—যেমন সেজদা, নামাজ বা রোজা—এখন আর অস্বাভাবিক নয়। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছেন খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকজন মুসলিম ফুটবলার।
ইয়ামালের সেজদা ও ধর্মীয় পরিচয়
স্পেন ও বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের পর সেজদা দিয়ে উদযাপন করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন।
এর আগে মার্চে স্পেন ও মিসরের প্রীতি ম্যাচে গ্যালারির একাংশ থেকে ‘যে লাফায় না, সে মুসলিম’ স্লোগান দেওয়া হলে ইয়ামাল সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম। ফুটবল মানুষের আনন্দ ও অনুপ্রেরণার জন্য, কারও ধর্মকে অসম্মান করার জন্য নয়।”
রুডিগারকে ঘিরে বিতর্ক
জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার ২০২৪ সালে রমজান উপলক্ষে ইনস্টাগ্রামে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে এক আঙুল উঁচিয়ে একটি ছবি পোস্ট করেন। পরে একটি জার্মান সংবাদমাধ্যম সেটিকে উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দিলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। রুডিগার এ ঘটনায় মানহানির অভিযোগও করেছিলেন।
সুইডেনের আইয়ারি ও পরিচয়ের বিতর্ক
সুইডেনের মিডফিল্ডার ইয়াসিন আইয়ারি তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করে সেজদার মাধ্যমে উদযাপন করেন। তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত এই ফুটবলারকে নিয়ে সুইডেনে জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও তার বাবা বলেন, ছেলে সুইডেনেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে, তাই সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে।
ধর্মান্তরিত মুসলিম ফুটবলারদের সংখ্যা বাড়ছে
অভিবাসী পরিবারের পাশাপাশি ইউরোপে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারের সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ক্লারেন্স সিডর্ফ (নেদারল্যান্ডস)
ফ্রেডেরিক কানুতে (ফ্রান্স/মালি)
পল পগবা (ফ্রান্স)
ডেড স্পেন্স (ইংল্যান্ড)
ডেড স্পেন্স বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেকের পর দেশটির প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তিনি বলেন, এই অর্জন বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।
কেপ ভার্দে দলে ইসলামের প্রভাব
কেপ ভার্দে জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ও খেলোয়াড়ি জীবনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। জামিরো মন্তেইরো, লোগান কস্তা ও স্টিভেন মোরেইরা নিজেদের আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
লোগান কস্তা জানান, একজন মুসলিম সতীর্থের সঙ্গে বসবাসের সময় নামাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে স্টিভেন মোরেইরা বলেন, সতীর্থ আব্দুল্লাহ দুকুরের নামাজ ও রোজা পালনের জীবনধারা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং পরে তিনি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য
২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে গোলের পর কেপ ভার্দের তিন মুসলিম খেলোয়াড় একসঙ্গে সেজদা দিয়ে উদযাপন করেন। তাদের মতে, ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং দলীয় ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। জাতীয় দলে মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়, যা পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই







