বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় নতুন ও জটিল এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। কোনো সন্দেহভাজন পাচারকারীর বিরুদ্ধে তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে আবেদন করার প্রক্রিয়া শুরু হতেই সেই অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে ফেলছে অপরাধীরা। এর ফলে অর্থ পাচারের তদন্তের যোগসূত্র ভেঙে যাচ্ছে এবং আইনি তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত ২১ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির ২৮তম সভায় এই উদ্বেগজনক চিত্রটি উঠে আসে। সভায় বলা হয়, আইনি প্রক্রিয়া ও সময়ক্ষেপণের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা অর্থ স্থানান্তর করে ফেলায় তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে কোনো দেশে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য চেয়ে আবেদনের ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস হয়ে সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই অর্থ সরিয়ে ফেলার সময় পেয়ে যাচ্ছে।
এই দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে গন্তব্য দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি ও দ্রুত যোগাযোগের একটি বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তথ্য আদান-প্রদান অনেক দ্রুত হবে এবং অপরাধীদের অর্থ সরানোর সুযোগ কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বিশ্বের ১০টি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা (এমএলএ) চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং-চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। বাকি সাতটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে (মিসইনভয়েসিং) মূলত এই অর্থ পাচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া এসব অর্থের সিংহভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ডস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে। এই দেশগুলোর সঙ্গে আর্থিক তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ গোয়েন্দা সংস্থা ‘এগমন্ট গ্রুপ’-এর সদস্য হলেও এখনো আর্থিক তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময়ের বৈশ্বিক ব্যবস্থা ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ (সিআরএস)-এ যুক্ত হতে পারেনি। প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার শেষ না হওয়ায় এই সক্ষমতা অর্জন করা যায়নি, যা অর্থ ফেরানোর কাজকে এখনো কঠিন করে রেখেছে।







