রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে একটি নতুন নিষেধাজ্ঞার বিল অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হয়ে আইনে পরিণত হলে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক শীর্ষ পাঁচ দেশের ওপর এই শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্ভাব্য এই ভারী শুল্কের তালিকায় সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ভারত ও চীনের ওপর।
বিক্ষুব্ধ ইউক্রেনের কট্টর সমর্থক ও রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে এই বিলটির নামকরণ করা হয়েছে ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট ২০২৬’। গত ১১ জুলাই গ্রাহাম আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন।
মার্কিন সিনেটে ঐতিহাসিক এই বিলটি ৮৬-১১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে অনুমোদন পায়। লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর সিনেটে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া বোন ডার্লিন গ্রাহাম বলেন, এই বিলটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এমন জায়গায় আঘাত করবে, যেখানে তিনি সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করবেন। এটি পুতিনের যুদ্ধ অর্থনীতিকে সচল রাখা দেশগুলোকে আমেরিকা অথবা সস্তা রুশ জ্বালানির মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করবে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালও গ্রাহামের সঙ্গে যৌথভাবে এই বিলটি পাসের জন্য কাজ করেছেন। বিলটি অনুমোদনের পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আজ প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেন থেকে এবং পুতিন মস্কো থেকে এই দৃশ্য দেখছেন। এই স্লেজহ্যামার নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের মাধ্যমে ইউক্রেনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপরাধমূলক যুদ্ধে যারা রাশিয়ার সহযোগী, তাদের থামানো সম্ভব হবে।
সিনেটে পাস হওয়ার পর বিলটি এখন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) পাঠানো হচ্ছে। আগামী ৩১ আগস্ট প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে সেখানে বিলটি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
বর্তমানে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ভারত ও চীনের পাশাপাশি আমদানির শীর্ষ তালিকায় রয়েছে আজারবাইজান, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া। তবে নতুন বিলে কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তাদের মোট চাহিদার ১৫ শতাংশের কম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তারা এই শুল্কের আওতা থেকে ছাড় পেতে পারে।
এই বিলটিতে শুধু শুল্ক আরোপের বিষয়ই নয়, বরং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা, বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি প্রকল্পের ওপর পূর্ণ ব্লকিং নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মস্কো যেসব পুরোনো তেলবাহী জাহাজের পতাকা বা নাম পরিবর্তন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সেগুলোকে জব্দ করাসহ বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ থাকছে।
তবে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় মার্কিন জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে প্রেসিডেন্টকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট চাইলে যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে এই নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক থেকে ছাড় (ওয়েভার) দিতে পারবেন, তবে এ ক্ষেত্রে ওই সিদ্ধান্ত কেন জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয়, তার যৌক্তিক প্রমাণ মার্কিন কংগ্রেসের কাছে জমা দিতে হবে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর সব ব্যবস্থার পাশাপাশি এই বিলে ১৯৯৬ সালের ‘ইরান স্যাংশনস অ্যাক্ট’-এর মেয়াদ আগামী ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই আইনের আওতায় ইরানের জ্বালানি, শিপিং ও আর্থিক খাতে বিনিয়োগকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ আরও দীর্ঘ হলো।







