দেশে আবারও বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে গ্রামের মানুষকে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি, ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র থেকে সীমিত উৎপাদন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে দেশে দৈনিক সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন তা ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সংকট কাটেনি। গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধে এখনো সংকটে রয়েছে পিডিবি। বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে পিডিবির বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময়ে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি কাজে লাগানো যায়নি।
গ্যাসের সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার মেগাওয়াটের কম। অন্যদিকে কয়লাচালিত কয়েকটি বড় কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে যায়। পরে রোববার রাত থেকে কেন্দ্রটি আবার উৎপাদন বাড়াতে শুরু করে।
ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমেছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কেন্দ্রটি স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। তবে ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট সকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের স্বল্পতার পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। তেলচালিত কেন্দ্রগুলো সারা দিন চালানো ব্যয়বহুল হওয়ায় সন্ধ্যার পর লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন বাড়ানো হয়। মধ্যরাতের পর উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হলে লোডশেডিং আবার বেড়ে যায়।
গ্রামের মানুষ বেশি ভোগান্তিতে
ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসিতে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ ঘাটতি তুলনামূলক কম। তবে ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি বেশি। সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
ফেনীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন গড়ে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারখানার উৎপাদনে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হচ্ছে।
নেত্রকোনার পূর্বধলায় স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে পাঁচ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট।
হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে চা–পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হয়ে বাগানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
কেরানীগঞ্জেও ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। স্থানীয় বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
নীলফামারীর ডোমারেও প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অনেক গ্রাহক দিনে ১০ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত না করে অতীতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলো বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বিপুল বকেয়া ও ভর্তুকির চাপের পাশাপাশি এখন জ্বালানি সংকটও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ফলে ঢাকার তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষই লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।







