ইলিশের ভরা মৌসুমে যেখানে সাগরজুড়ে জেলেদের ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে তীব্র বরফ সংকটে ঘাটে অলস পড়ে আছে শত শত মাছধরা ট্রলার। সাগরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি থাকলেও শুধু মাছ সংরক্ষণের প্রধান উপাদান বরফের অভাবে জেলেরা ঘাট ছাড়তে পারছেন না। এই নজিরবিহীন সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে তীব্র ও অতিমাত্রার লোডশেডিং।
স্থানীয় বরফকল মালিকরা জানিয়েছেন, ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মিলগুলোতে বরফ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভরা মৌসুমে যখন বরফের চাহিদা তুঙ্গে, ঠিক তখনই সরবরাহ নেমে এসেছে তলানিতে। গত এক সপ্তাহ ধরে মহিপুর ও আলীপুর ঘাটে আটকা পড়ে আছে অসংখ্য ট্রলার। সংকটকে পুঁজি করে বরফের দাম রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে গেছে; আগে যে বরফের একটি ক্যান ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন কালোবাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। এমনকি চড়া দাম দিয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় বরফ।
মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বরফের জন্য টানা পাঁচ দিন ধরে অপেক্ষা করছেন চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ‘এফবি সোনাবানু’ ট্রলারের মাঝি সায়েদ মিয়া। তিনি জানান, সাগরে গভীর পানিতে মাছ শিকারের জন্য তাঁর ট্রলারে কমপক্ষে ১৫০ থেকে ২০০ ক্যান বরফ প্রয়োজন। কিন্তু আড়ত ও কলগুলো ঘুরে দ্বিগুণ দামে মাত্র ৫০-৬০ ক্যান বরফ জোগাড় করতে পেরেছেন, যা নিয়ে সাগরে যাওয়া অসম্ভব। অন্যদিকে আলীপুর মৎস্য বন্দরে নোঙর করে রাখা ‘এফবি নুরজাহান’ ট্রলারের মালিক মিজান হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে বরফ না পেয়ে ঘাটে বসে থাকায় প্রতিদিন তাদের হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
সংকট এতটাই ঘনীভূত হয়েছে যে, আলীপুরের আড়তদাররা এখন স্থানীয় কলের ওপর ভরসা ছেড়ে দূরদূরান্ত থেকে বরফ আমদানি করছেন। খান ফিশের স্বত্বাধিকারী রহিম খান জানান, আড়তের ব্যবসা সচল রাখতে বাধ্য হয়ে তাঁরা খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল থেকে ট্রাকে করে বাড়তি ভাড়ায় বরফ আনিয়ে নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন খরচ ও সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসার চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মৎস্য ব্যবসায়ীদের মতে, বরফের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট শুধু জেলেদের নয়, ট্রলার মালিক ও আড়তদারসহ পুরো ইলিশ শিল্পের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বরফকল মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ ছাড়া বরফ জমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই মৎস্য বন্দর দুটিতে জাতীয় স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তবে পটুয়াখালী পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কাশেম এই মুহূর্তে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেননি। তিনি জানান, দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণেই মূলত জেলাজুড়ে এই লোডশেডিং চলছে।
পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পটুয়াখালী জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বিশাল ঘাটতি থাকছে। চাহিদার মাত্র ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়ায় বাধ্য হয়েই রেশনিং বা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকা দেশের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু হলে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।







