বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে স্থানান্তরের পরামর্শ দিয়ে একসময় কলাম লেখা প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আনিস আলমগীর এখন দলটির অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তাঁর এক নৈশভোজে (ডিনার) অংশ নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে জিয়ার কবর সরানো নিয়ে দেওয়া তাঁর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক যুক্তি এবং বর্তমান বিএনপির সঙ্গে তাঁর এই ঘনিষ্ঠতা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
এর আগে ২০২১ সালে চন্দ্রিমা উদ্যানে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিয়ার কবরে আদৌ কোনো মরদেহ নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই সময় রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্র ধরে আনিস আলমগীর এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রীয় বা সচিবালয় নির্মাণের প্রয়োজনে চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে জিয়ার কবর স্থানান্তর করা হলে তাতে ধর্মীয় কোনো বাধা নেই। তিনি ইসলামি ইতিহাস ও সাহাবাদের কবর স্থানান্তরের উদাহরণ টেনে উল্লেখ করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কবর সরানো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তৎকালীন সরকারের সেই রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষে মত দেওয়া এই কলামিস্টের সঙ্গে এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দহরম-মহরমকে অনেকেই নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।

আনিস আলমগীর সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ আইন মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলায় বিরোধী দলগুলোর আপত্তির কড়া সমালোচনা করে তিনি লিখেছিলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রিধারী একজন সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী। একই সঙ্গে ৭ম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে আইন ও প্রশাসন—উভয় বিষয়েই তাঁর বক্তব্য দেওয়ার পূর্ণ যোগ্যতা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিগত ড. ইউনূসের সরকারের আমলে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছিলেন।
আনিস আলমগীরের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদের অতীত রাজনৈতিক জীবনের আরও একটি বিস্ফোরক সত্য প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেফতার হওয়ার পর সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ভিডিও বার্তা দিতে গিয়ে শেখ হাসিনার রোষানলে পড়েন। সেই সময় সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হননি, বরং সরকারের ভেতরে থাকা তাঁর তৎকালীন আমলা বন্ধুরা মূলত তাঁর জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গোপনে তাঁকে দেশের বাইরে (ভারতে) পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আনিস আলমগীর সালাহউদ্দিন আহমেদকে বর্তমান সময়ে বিএনপির ‘ছায়া মহাসচিব’ হিসেবেও অভিহিত করেন।
লেখক ও কলামিস্ট আনিস আলমগীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে বরং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা এবং বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা করা উচিত। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে যে ‘মব কালচার’, ভুয়া মামলা ও চাঁদাবাজি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কতটা সফল হচ্ছেন—সেটিই হওয়া উচিত মূল আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়ার কবর সরানোর পরামর্শ দেওয়া একজন কলামিস্টের সঙ্গে বিএনপির বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নৈশভোজ ও প্রকাশ্য প্রশংসা প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই এবং সময়ের প্রয়োজনে চিরশত্রুও পরম মিত্রে পরিণত হতে পারে।







