দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ পদে দায়িত্ব পালনকালে ঘটে যায় ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ভয়াবহ গণহত্যা। ছাত্র–জনতার আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গুলি ও নৃশংসতার ঘটনাগুলো সে সময়ই আলোচনায় আসে। সরকারের পতনের পর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তৎকালীন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় অভিযুক্ত হয়েও তিনি রাজসাক্ষী হন এবং আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের সাবেক নিয়োগকর্তা শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেন। তার সাক্ষ্যে প্রকাশ্যে আসে বহু অজানা তথ্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থনের অপরাধ স্বীকার
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ট্রাইব্যুনালে স্বীকার করেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশেই ছাত্র–জনতার ওপর গণহত্যা চালানো হয়। দায়িত্বকালীন সময়ে এ ভয়াবহ ঘটনা ঘটায় তিনি দায় স্বীকার করে নিহত পরিবার, আহত ব্যক্তি, দেশবাসী এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতির প্রক্রিয়াও বর্ণনা করেন।
তিনি জানান, অপরাধবোধের তাড়নায় এবং বিবেকের নির্দেশে তিনি নিজ থেকেই রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এই মামলার ৩৬তম সাক্ষী।
পুলিশের চেইন অব কমান্ডে গোপালগঞ্জ কেন্দ্রিক বলয়
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি আইজিপি হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। পুলিশের উচ্চপর্যায়ে গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক গ্রুপিং এতই দৃশ্যমান ছিল যে, বাহিনীর সুনাম রক্ষার্থে তাকে একাধিকবার চাকরি–মেয়াদ বাড়ানো হয়।
পুলিশের রাজনীতিকরণ
২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে পুলিশে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়। গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়, পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে থাকেন এবং সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে পুলিশ ব্যবহৃত হয়। এতে সিনিয়র কর্মকর্তাদের ন্যায়সংগত নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৮ সালের রাতের ভোটে জাবেদ পাটোয়ারীর ভূমিকা
তিনি জানান, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় ডিআইজি হিসেবে দায়িত্বপালনকালে জানতে পারেন, তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী প্রধানমন্ত্রীর কাছে নির্বাচনের আগের রাতে ৫০% ব্যালট আগাম ব্যালটবাক্সে ঢুকিয়ে রাখার পরামর্শ দেন। সরকারি নির্দেশনায় মাঠ প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ সেটা বাস্তবায়ন করে।
যারা নির্দেশনা পালন করেন, তাদের বিপিএম–পিপিএম দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসার গোপন বৈঠক
২০১৮–এর পর পুলিশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বাসায় প্রায়ই রাতভর বৈঠক হতো, যেখানে অংশ নিতেন কয়েকজন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা—
ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবি প্রধান হারুনুর রশিদসহ আরও অনেকে।
তাদের কয়েকজনের প্রধানমন্ত্রীর সাথেও সরাসরি যোগাযোগ ছিল। ফলে তারা অনেক সময় চেইন অব কমান্ড মানতেন না।
র্যাব–১–এ ‘আয়নাঘর’ (টিএফআই সেল)
২০১৪–২০২২ সময়ে র্যাব ডিজি হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি জানতে পারেন যে, র্যাব–১ কমপাউন্ডে ‘টাস্ক ফোর্স ইন্টার্রোগেশন সেল (টিএফআই সেল)’ নামে একটি গোপন বন্দিশালা ছিল যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের আটক ও নির্যাতন করা হতো—যা র্যাবের এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল।
র্যাবের অপারেশন এবং ইন্টেলিজেন্স শাখা অপহরণ, নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের মতো কাজগুলো সমন্বয় করত।
সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গুম–নির্যাতন
তিনি বলেন, র্যাবের মাধ্যমে কাউকে তুলে আনা বা হত্যা করার নির্দেশ সাধারণত প্রধানমন্ত্রী দপ্তর থেকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দীকির মাধ্যমে আসত। এসব নির্দেশ চেইন অব কমান্ড ভেঙে সরাসরি র্যাবের অপারেশন ও ইন্টেলিজেন্স শাখায় পাঠানো হতো।
তিনি ব্যারিস্টার আরমানের গোপন আটক অবস্থার কথা একাধিকবার উপদেষ্টাকে জানান, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত পাননি।
ডিজিএফআইয়ের পরামর্শে আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক
জুলাই আন্দোলন চলাকালে প্রতিদিন রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় কোর কমিটির বৈঠক বসত। সেখানে উপস্থিত থাকতেন সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা।
এক বৈঠকে ডিজিএফআই আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক করার প্রস্তাব দেয়। তিনি আপত্তি জানালেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে ডিবি তাদের আটক করে। পরবর্তীতে তাদের আত্মীয়দেরও এনে চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্তে টেলিভিশনে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয়।
‘জ্বীন’ নামে পরিচিত ডিবি প্রধান হারুন
ডিবি প্রধান হারুনুর রশিদকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী “জ্বীন” বলে ডাকতেন—কারণ তিনি সরকারের নির্দেশনা দ্রুত ও কঠোরভাবে বাস্তবায়নে সক্ষম ছিলেন।
হেলিকপ্টার–ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাব
আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের পরামর্শ দেন র্যাব ডিজি হারুন। পরে আন্দোলনপ্রবণ এলাকাকে ভাগ করে ব্লকরেইড চালানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ল্যাথাল উইপন ব্যবহারের আদেশ
তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন করে তাকে জানান যে, প্রধানমন্ত্রী আন্দোলন দমনে সরাসরি মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ১৮ জুলাই ২০২৪ থেকে ল্যাথাল উইপন ব্যবহার শুরু হয়। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও ডিবি প্রধান হারুন ছিলেন এতে সবচেয়ে উৎসাহী।
সরকারের একাধিক প্রভাবশালী নেতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এ ধরনের শক্ত ব্যবহারের সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করতেন।







