এক যুগ আগে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে ঘিরে সংঘটিত অভিযানে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিরীহ আলেম ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। নিহতদের মধ্যে অনেকের মরদেহ রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।
হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। তদন্তে নিহতদের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৩০ জনকে এ মামলায় আসামি করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ তদন্তকাজ শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। আগামী ৭ জুন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন নির্ধারণ রয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনাকেই এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তদন্তে পাওয়া গেছে। তিনি জানান, তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আরও অনেকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
তিনি আরও জানান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত অপরাধ’।
শাপলা চত্বরের ঘটনার পর একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত ‘সমীকরণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, দেশজুড়ে আলোচিত ওই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে সাংবাদিক ফারজানা রুপা বিতর্কিত কিছু ব্যক্তি ও আওয়ামী লীগ-সমর্থক কয়েকজন হুজুরবেশী ব্যক্তির বক্তব্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। এর মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ প্রসিকিউশনের। এ ঘটনায় দীপু মনি, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে আগামী ১৪ মে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে দিন ও রাতে শুধু ঢাকার শাপলা চত্বর এলাকায় ৩২ জন নিহত হন। তদন্ত সংস্থা এসব নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। কয়েকজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও অনেকের হয়নি। তবে কবর, স্বজনদের সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ৬ মে নারায়ণগঞ্জে ২০ জন নিহত হন, যাদের পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হন।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক আইজিপি কেএম শহীদুল হক, হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।
এদিকে মামলায় পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ ২০২১ সালের ১০ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তারা ৬১ জন নিহতের নাম সংগ্রহ করেছিল। পরে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংগঠনটি তাদের ফেসবুক পেজে ওই ৬১ জনের নাম-পরিচয় প্রকাশ করে।
