চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে তিন বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, এক উপ-পুলিশ কমিশনারের ওপর হামলা এবং এলাকায় চরম অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় একযোগে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পাশাপাশি এক চাঞ্চল্যকর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা শুধু ওইদিনের সহিংসতার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না, বরং তাঁরা ওই আলোচিত ধর্ষণ মামলার মূল আসামিকে পিটিয়ে হত্যার এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও করেছিলেন। আসামিকে আদালতে তোলার সময় অথবা পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন আক্রমণ করে পিটিয়ে মেরে ফেলার এই ছক মূলত ‘সরকারকে বিব্রত করা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে’ করা হয়েছিল। তবে পুলিশের সময়োপযোগী তৎপরতায় সেই ভয়াবহ পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোলাইমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনার পর সিসিটিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা মূলত শিশু ধর্ষণের ঘটনাটিকে পুঁজি করে এলাকায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। গ্রেপ্তারকৃত ১১ জনের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে সরাসরি পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং দুজনের বিরুদ্ধে উপ-পুলিশ কমিশনারের ওপর হামলার প্রমাণ মিলেছে। বাকিদের বিরুদ্ধে সামগ্রিক নাশকতা ও পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে গত ২১ মে বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে ৩ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে স্থানীয় এক ডেকোরেশন কর্মচারী মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার পর পুরো এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে এবং বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ভাঙচুর ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে এই উত্তেজনা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও ছড়িয়ে পড়ে এবং সড়ক অবরোধের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছিল।
সহিংস পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ওইদিনই মাঠে নেমে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রক্ষা করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সোমবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং বাকিরা স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার ছিন্নমূল তরুণ। তারা মূলত এলাকায় আরও বড় অস্থিরতা তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে জনগণের সামনে ‘দুর্বল ও ব্যর্থ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আসামিকে পিটিয়ে হত্যার ছক কষেছিল।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ সংশ্লিষ্ট ধারায় পৃথক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। সহিংসতার পেছনে আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যান্যদেরও শনাক্ত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ভুক্তভোগী পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।







