ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বার্তা নিয়ে মুসলমানদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আগামী বৃহস্পতিবার ১০ জিলহজ সারা দেশে উদযাপিত হবে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। ঈদের নামাজ, পশু কোরবানি এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগিকে ঘিরে দেশজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়— “শহীদের ঈদ এসেছে আজ শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ, আল্লার রাহে চাহে সে ভিখ : জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে আল্লার রাহে তাহারে দে, চাহি না ফাঁকির মণিমানিক।”
বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহা উদযাপিত হলেও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বুধবার ঈদ উদযাপিত হবে।
ঈদের দিন সকালে ঈদগাহ, মসজিদ ও খোলা ময়দানে জামাতের সঙ্গে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের পর ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করবেন। এর মধ্য দিয়ে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আনন্দের বার্তা।
দেশের প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৭টায়। তবে আবহাওয়া প্রতিকূল হলে প্রধান জামাত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বায়তুল মোকাররমে সকাল ৭টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের কাছে এটি কোরবানির ঈদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। এদিন ঈদের নামাজ আদায়ের পাশাপাশি গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা কিংবা উট কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা হয়।
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়ে আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি দুম্বা কোরবানির মাধ্যমে সেই নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়। সেই ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলমানরা প্রতিবছর পশু কোরবানির মাধ্যমে আত্মত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করেন।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ—এই তিন দিনের যেকোনো দিন পশু কোরবানি করা যায়। ফলে ঈদের আনন্দও স্থায়ী হয় কয়েকদিনজুড়ে।
পবিত্র হজ পালন উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার আরাফাতের ময়দানে হজের প্রধান কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে। ১২ জিলহজ পর্যন্ত ধাপে ধাপে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন হাজিরা।
অন্যদিকে সৌদি আরবে বুধবার ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের কয়েকটি এলাকাতেও একদিন আগে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসেছে কোরবানির পশুর হাট এবং জমে উঠেছে বেচাকেনা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশে কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে।
পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য রাজধানী ও বড় শহর ছেড়ে গ্রামের পথে ছুটছেন মানুষ। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও বিমানে বেড়েছে যাত্রীর চাপ। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
ঈদ উপলক্ষে সরকারি অফিস-আদালতেও শুরু হয়েছে টানা ছুটি। অনেকেই ইতোমধ্যে ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। তবে কারাগার, হাসপাতাল ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত অনেক মানুষের ঈদ কাটবে কর্মব্যস্ততার মধ্যেই।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ।
সরকারের পক্ষ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে টানানো হবে “ঈদ মোবারক” লেখা ব্যানার ও ফেস্টুন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বিভিন্ন বেসরকারি গণমাধ্যমে প্রচার করা হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধাশ্রম ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতেও যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।







