হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কঠোর প্রতিবাদ’ জানিয়েছে ভারত। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার ওমান উপসাগরে চলাচলরত ‘এমটি সেট্টেবেলো’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তাদের যুদ্ধবিমান। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পালাউয়ের পতাকাবাহী জাহাজটির ক্রুরা বারবার নির্দেশনা অমান্য করায় এই ‘নির্ভুল হামলা’ চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনের অভিযোগ, জাহাজটি ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করছিল। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে এবং শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে গত এপ্রিল থেকে এই অবরোধ কার্যকর করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের পর থেকে এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে নির্দেশনা না মানা নয়টি জাহাজ অচল ও ১৩৫টি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে।
হামলার পর জাহাজে থাকা ২১ জন ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করা গেলেও তিনজন নিখোঁজ ছিলেন। বৃহস্পতিবার ভারত সরকার নিশ্চিত করে, নিখোঁজদের মরদেহ জাহাজের ভেতর থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলেন—প্রধান প্রকৌশলী পতনালা সুরেশ, ডেক ক্যাডেট আদিত্য শর্মা ও ফিটার শিবানন্দ চৌরাসিয়া। অবরোধ শুরুর পর এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিককে তলব করেছে ভারত সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সাওয়াল বলেন, এই হামলা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। ভারতের নৌপরিবহন ও বন্দরমন্ত্রী সর্বানন্দা সোনোয়ালও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এদিকে ভারতীয় নাবিকদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনোজ যাদব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী নিশ্চিতভাবেই জানত জাহাজগুলোতে কতজন ভারতীয় ও বিদেশি নাগরিক ছিলেন। জাহাজগুলো নির্দেশনা না মানলে সেগুলো আটক করা যেত, কিন্তু এভাবে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।
চলতি সপ্তাহে ভারতীয় ক্রু থাকা মোট তিনটি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন হামলার শিকার হয়েছে। এর আগে সোমবার ‘মারিভেক্স’ নামের একটি ট্যাংকারে মার্কিন যুদ্ধবিমান হামলা চালালে সেটিতে আগুন ধরে যায়। এছাড়া বৃহস্পতিবার গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী আরেকটি ট্যাংকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় মার্কিন বাহিনী। ভারত সরকার জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা ভারতীয় নাগরিক ও জাহাজের নিরাপত্তা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
উল্লেখ্য, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক নৌ-শ্রমিক সরবরাহকারী দেশ, যেখানে বৈশ্বিক সামুদ্রিক শ্রমশক্তির প্রায় ১৫ শতাংশই ভারতীয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজগুলোতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।







