প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে শ্রমিকবান্ধব নয়, বরং এলিটবান্ধব বলে অভিহিত করেছেন শ্রমিক নেতারা। তাদের মতে, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ ও প্রয়োজন যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ায় বাজেটটি দেশের বৃহৎ শ্রমিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেন, শ্রমিকবান্ধব নীতির অভাব দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা: শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় কর্মহীন, অবসরপ্রাপ্ত ও প্রবীণ শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়া বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনমান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হলেও বেসরকারি খাতের বিপুল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মজুরি, জীবনমান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকে। এই বৈষম্য দূর করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সংগঠনটির বাজেট-সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, গত ২৪ মে তারা শ্রমিকবান্ধব বাজেটের লক্ষ্যে প্রায় ৩০টি সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে শ্রমিকদের ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়ন, নারী শ্রমিকদের জন্য পরিবহন সুবিধা এবং জেলে পরিবারগুলোর জন্য ভিজিএফ সহায়তার বিষয়গুলো বাজেটে স্থান পেয়েছে।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো বাজেটে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। গত এক দশকের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রমিক খাতে বরাদ্দ ও অগ্রাধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে এবারের বাজেট তুলনামূলকভাবে আরও পিছিয়ে রয়েছে।
আতিকুর রহমান বলেন, বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ না থাকায় শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব চাহিদা প্রতিফলিত হয়নি। ফলে এটি শ্রমিকবান্ধব বাজেটের পরিবর্তে এলিটবান্ধব বাজেটে পরিণত হয়েছে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, মহার্ঘ্য ভাতা, পরোক্ষ কর হ্রাস, স্বল্পমূল্যের আবাসন প্রকল্প, মজুরি সুরক্ষা তহবিল, স্বাস্থ্যবিমা, ঝুঁকি ভাতা এবং পেশাগত বিমা চালুর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী—এমন প্রত্যাশাই শ্রমিকসমাজের।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক হারুনুর রশিদ, এ এম ফয়েজ আহমদ, সাকিল আখতার চৌধুরী, গোলাম রব্বানী, কবির আহমদ, অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন, আব্দুস সালাম, মাওলানা মহিবুল্লাহ, আজহারুল ইসলাম, নজরুল আমিন, সোহেল রানা মিঠু, ওমর ফারুক, নুরুল ইসলাম, আ ন ম বজলুর রহমান, আবুল হোসেন, ওসমানগণি, জামিল মাহমুদ ও হাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।







