বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের নতুন প্রত্যাশা নিয়ে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই উচ্চপর্যায়ের সফরকে ঘিরে দেশের সরকার ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এরই মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নসহ বড় বড় মেগা প্রকল্পে চীনা অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোকে বেগবান করেছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রধান আমদানিকারক দেশ। দেশের শিল্প খাতের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, শিল্প কাঁচামাল ও টেক্সটাইল ইনপুটের বড় অংশই আসে চীন থেকে।
প্রধানমন্ত্রী গত রোববার (২১ জুন) তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে দু’দিনের সফরে মালয়েশিয়া যান। মালয়েশিয়া সফর শেষে সোমবার (২২ জুন) রাতে কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি।
সই হতে পারে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গত শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, সফরকালে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তিনি বলেন, “চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে।” আসাদ আলম আরও জানান, এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা ও প্রটোকল সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরের শুরুতে দালিয়ানে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। এরপর তিনি ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পরে বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, এক্সিম ব্যাংকসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ তিনি প্রধান বক্তা হিসেবে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও বিনিয়োগ বহুমুখীকরণের তাগিদ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে এই বাণিজ্যের কাঠামো মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি অংশ তুলনামূলকভাবে বেশ কম। তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে চীন বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই) কাঠামোর আওতায় সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এই উদ্যোগগুলোর আওতায় প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদন শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও লজিস্টিকসে সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় উভয়ই বাড়বে।
টাকা-ইউয়ানে লেনদেন ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।” তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বাংলাদেশে কাজে লাগানো গেলে দেশীয় পুঁজিবাজার আরও গভীর ও স্থিতিশীল হতে পারে।
তবে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ টানতে হলে সুস্পষ্ট নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং লেনদেন ব্যয় হ্রাস করবে।
চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি সিসিইসিসির দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ শু জানান, চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বিডা আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ চীনা ব্যবসায়ীরা অংশ নেবেন এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেবেন। ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি মূলত তিনটি মূল বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে— বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর।







