ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর বিস্তার ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং গোপন গোয়েন্দা তৎপরতায়ও। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রুশ অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চলে প্রতিরোধ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন বহু নারী, যাদের স্থানীয়ভাবে বলা হচ্ছে ‘ভিডমা’ বা ‘ডাইনি’।
ইউক্রেনীয় লোককাহিনিতে ‘ভিডমা’ বলতে এমন নারীকে বোঝানো হয়, যিনি বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী। বর্তমানে এই শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেইসব নারী প্রতিরোধকর্মীর ক্ষেত্রে, যারা অধিকৃত অঞ্চল থেকে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সহায়তা করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের গোয়েন্দা ও প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক বিভিন্ন কৌশলে রুশ সেনাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। এক ঘটনায় দেখা যায়, এক রুশ সেনা দীর্ঘদিন ধরে একজন ইউক্রেনীয় নারীর সঙ্গে অনলাইনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন বলে বিশ্বাস করেন। একপর্যায়ে ওই নারীর অনুরোধে তিনি নিজের অবস্থানসংবলিত একটি ছবি পাঠান। ছবির পটভূমিতে থাকা একটি অস্পষ্ট মানচিত্র থেকে সামরিক ঘাঁটির অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং পরে সেখানে ড্রোন হামলা চালানো হয়।
পরে জানা যায়, ওই নারী বাস্তবে ছিলেন না; অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের চার বছরে ইউক্রেনের প্রতিরোধ কৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ছোট ছোট তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর নির্ভুল অবস্থানে রূপান্তর করা হচ্ছে, যার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে ড্রোন অভিযান।
ইউক্রেনের সাবেক সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটস বলেন, ‘ভিডমা’রা বর্তমানে রুশ চেকপয়েন্ট অতিক্রম করে, হাসপাতাল, স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছেন। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা ইউক্রেনীয় সমাজে বিশেষভাবে মূল্যায়িত হয়।
মারিউপোলভিত্তিক প্রতিরোধ নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক পেত্রো আন্দ্রিউশচেঙ্কো বলেন, নারীরা এমন অনেক স্থানে সহজে যেতে পারেন, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ কঠিন। ফলে প্রতিরোধ আন্দোলনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে ‘রোকসানা’ ছদ্মনামে পরিচিত এক নারীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। খেরসনের একটি ক্লিনিকে কর্মরত এই নারী যুদ্ধের কারণে দেশ ছাড়লেও বর্তমানে বিদেশে বসে ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার জন্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে কাজ করছেন। স্থানীয় এলাকার রাস্তা, গুদামঘর ও অবকাঠামো সম্পর্কে তার বিস্তারিত জ্ঞান ড্রোন হামলার পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে ইউক্রেনিয়ান উইমেনস গার্ডের প্রধান ওলেনা বিলেতস্কা জানান, ২০১৪ সাল থেকে তার সংগঠন ৬০ হাজারের বেশি নারীকে আত্মরক্ষা, বেঁচে থাকা এবং প্রতিরোধ কৌশলের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের অনেকে বর্তমানে অধিকৃত অঞ্চলে বিভিন্নভাবে প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অধিকৃত অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনের ৪২৬তম আনম্যানড সিস্টেমস রেজিমেন্টের ড্রোন ইউনিট নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর কখনও কখনও মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই হামলা চালানো সম্ভব হয়।
মারিউপোলে সক্রিয় ‘সেস্ত্রা’ নামে পরিচিত এক প্রতিরোধকর্মী বলেন, রুশ সেনাদের মধ্যে স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের দাবি ও পাল্টা দাবির স্বাধীন যাচাই সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে প্রতিবেদনে উল্লিখিত কিছু তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।







