যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সফল অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার পর, এবার উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে বড় ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের দুটি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা কেন্দ্রের মধ্যে সম্পূর্ণ গোপনে এই শান্তি আলোচনা চালানো হচ্ছে।
২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের জেরে লিবিয়া মূলত পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা এই ঐতিহাসিক বিভাজন দূর করতে সম্প্রতি আমেরিকার নেতৃত্বে একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, যেখানে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। লিবিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়ায় সফল হলে বিশ্ব দরবারে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মর্যাদা ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রশংসা করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিবিয়ায় পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার বিষয়ে পুরোপুরি অবগত এবং এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা সৌদি আরবও এই শান্তি উদ্যোগে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে। লিবিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষই গত বছরের শেষের দিকে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা কামনা করলে মূলত এই গোপন প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়।
প্রস্তাবিত লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণ পরিকল্পনার একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া অনুযায়ী, দেশটিতে ‘গভর্মেন্ট অব ন্যাশনাল কনসেনসাস অ্যান্ড প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল’ নামক একটি ব্যবস্থার অধীনে ছত্রিশ মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতা অংশীদারিত্ব চুক্তি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় জাতিসংঘ স্বীকৃত পশ্চিমাঞ্চল ভিত্তিক সরকারের প্রধান আবদুলহামিদ দ্বিবাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকবেন এবং পূর্বাঞ্চল ভিত্তিক লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ডেপুটি কমান্ডার সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাবেন।
লিবিয়ার অধিকাংশ বড় তেলক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো সাদ্দাম হাফতারের পিতা ও লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রধান জেনারেল খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রাধীন। তাই প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে বাজেট সংক্রান্ত বিশেষ কর্তৃত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তান এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটি যাতে সক্রিয় ও টেকসই থাকে তা নিশ্চিত করতে গ্যারান্টার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। তবে এই পরিকল্পনাটি এখনো বিস্তারিত আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে একটি পাকিস্তানি সূত্র সতর্ক করেছে।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডিতে সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এর কয়েক দিন পরেই সাদ্দাম হাফতার ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট সে সময় এক বিবৃতিতে জানায় যে, মার্কো রুবিও লিবিয়ার নেতাদের বিভেদ ভুলে এক হওয়ার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং দেশটির একতার প্রতি ওয়াশিংটনের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, লিবিয়ায় আমেরিকা, তুরস্ক, মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় দেশগুলোর প্রভাবের তুলনায় পাকিস্তান একটি দ্বিতীয় সারির পক্ষ হলেও দেশটির সঙ্গে লিবিয়ার উভয় পক্ষেরই এমন একটি অনন্য সুসম্পর্ক রয়েছে যা অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির নেই। জাতিসংঘ আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর কাছে জেএফ-১৭ (JF-17) যুদ্ধবিমান এবং সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান বিক্রির মতো প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে, আবার পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারও সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি কৌশলগত আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে।
পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সূত্র আরও জানিয়েছে, লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারের অন্যতম বড় সমর্থক তুরস্ক এবং কাতার এই মধ্যস্থতায় অংশ নিতে পাকিস্তানকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে। তবে ভূরাজনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ইনফরমমির পরিচালক তারেক মেগেরিসি সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই তা স্থায়ী হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি উদাহরণ হিসেবে গত বছর রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর মধ্যকার একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করেন যা কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে গিয়েছিল।
এখন পর্যন্ত পাকিস্তান বা লিবিয়ার কোনো পক্ষের কর্মকর্তা অথবা কাতার, তুরস্ক, সৌদি আরব ও আমেরিকার মতো কোনো বিদেশী পৃষ্ঠপোষক দেশ এই গোপন মধ্যস্থতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য বা বিবৃতি প্রকাশ করেনি।







