প্রশাসনের বাধা অমান্য করে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাসজমিতে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল হাশেম। ইতোমধ্যে ভবনটির তৃতীয় তলার ছাদের ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। ১০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ১০ শতাংশ জমির ওপর এই বিশাল ফাউন্ডেশন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
দাউদকান্দির গৌরীপুর ইউনিয়নের গৌরীপুর বাজারে এই বহুতল ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫০০-৬০০ মিটার উত্তরে গৌরীপুর-হোমনা সড়কের পাশেই এই নির্মাণকাজ চলছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসন থেকে একাধিকবার স্থাপনা নির্মাণে স্পষ্ট বাধা দেওয়া হলেও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আবুল হাশেম প্রকাশ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযুক্ত আবুল হাশেম গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এলাকায় তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় কোনো ব্যক্তিই স্বনামে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু বছর ধরে এই মূল্যবান খাসজমিটির ওপর নজর ছিল এই বিএনপি নেতার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে গৌরীপুর-পেন্নাই এলাকার সচ্ছল বাসিন্দা ও আবুল হাশেমের চাচাতো ভাই মাসুদ আলমকে ভুয়া ভূমিহীন সাজিয়ে এই ১০ শতাংশ খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছিল। সেখানে অস্থায়ী টিনের ঘর নির্মাণ করে বসবাসের শর্তে প্রশাসন জমিটি দিলেও মাসুদ আলম কখনো সেখানে ঘরবাড়ি করেননি। পরে তিনি অবৈধভাবে গোপনে জমিটি বিএনপি নেতা আবুল হাশেমের নামে হস্তান্তর করেন।
দীর্ঘদিন বিষয়টি ধামাচাপা থাকলেও দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই জমিতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন আবুল হাশেম। এর পরই বিষয়টি জনসমক্ষে আসে এবং ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ঘটনাটি জেলা প্রশাসনের নজরে পড়লে উপজেলা ভূমি প্রশাসনকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই বিষয়ে বিএনপি নেতা আবুল হাশেম বলেন, “মাসুদ আলম আমার চাচাতো ভাই। খাসজমি তাঁর নামে বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে জায়গাটি আমার নামে রেজিস্ট্রি ও রেকর্ড করে নিয়েছি। সেখানে এখন আমি একটি ভবন নির্মাণ করছি।”
এদিকে দলীয় নেতার এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কারও ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না। ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
দাউদকান্দির সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড রেদওয়ানুল ইসলাম জানান, সরকারি খাসজমি তথ্য গোপন করে নিজের নামে বিএস রেকর্ড ও রেজিস্ট্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রাথমিক তদন্তে জালিয়াতির সত্যতা পাওয়ায় গত ২ জুলাই মামলা করার জন্য গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) বরাবর সমস্ত কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে।
দাউদকান্দির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তার ও কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মশিউজ্জামান যৌথভাবে জানান, ভবন তৈরি করার জায়গাটি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। খাসজমি নিজের নামে স্থানান্তর বা রেকর্ড করার পুরো প্রক্রিয়াটি বেআইনি। প্রশাসন থেকে একাধিকবার নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা অমান্য করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় এখন বিধি অনুসারে আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।







