সিনহুয়া-বাল্টিক আন্তর্জাতিক শিপিং সেন্টার উন্নয়ন সূচক (আইএসসিডিআই) ২০২৬-এ টানা ১৩তম বছরের মতো বিশ্বের শীর্ষ বন্দরনগরী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সিঙ্গাপুর। শক্তিশালী বন্দরসেবা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই কৃতিত্ব বজায় রেখেছে নগররাষ্ট্রটি। তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং বছরে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রাম এই বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে কখনোই স্থান পায়নি।
আইএসসিডিআই ২০২৬ সূচকে শীর্ষ দশের বাকি শহরগুলো হলো যথাক্রমে সাংহাই, লন্ডন, হংকং, দুবাই, নিংবো ঝৌশান, রটারডাম, নিউইয়র্ক, এথেন্স ও হামবুর্গ। অন্যদিকে ডিএনভি পাবলিকেশন ও মেনন ইকোনমিকসের ৩০টি বন্দরনগরীর তালিকায়ও জায়গা হয়নি চট্টগ্রামের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারছে না চট্টগ্রাম।
বৈশ্বিক সূচকে যখন চট্টগ্রামের এমন পিছিয়ে থাকা অবস্থা, ঠিক তখনই বর্তমানের এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে পুরো জেলা। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম মহানগরীসহ জেলার ১৬টি উপজেলা মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়েছে। রেকর্ড ৩৩৩ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়াসহ নিচু এলাকাগুলো কোমর পানিতে তলিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৪৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং জেলার দক্ষিণ অংশের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৬ থেকে ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি ও চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
এমন ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার মাঝেই নগরীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদিও ২০২৯ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে সিঙ্গাপুরের আদলে পরিচালনার উপযোগী করে তুলতে নতুন বে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় সিঙ্গাপুরের পিএসএ-এর সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ করতে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু বাস্তবে বন্দর ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের মডেল অনুসরণের কথা বলা হলেও চট্টগ্রামের ন্যূনতম নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩টি সংস্থার প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও শহরের পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরের বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বাঁধ, স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট এবং পাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে তারা শীর্ষ বন্দরনগরীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বিপরীতে চট্টগ্রাম মৌলিক নগর ব্যবস্থাপনার সংকটই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ, খাল ভরাট, পাহাড় কাটা ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই বিপর্যয় ডেকে আনছে। এবারের আকস্মিক দুর্যোগের পর প্লাবিত অঞ্চলে উদ্ধারকাজ চালাতে জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে এবং সাতকানিয়াসহ তীব্র ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের সুপরিচিত অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞরা জানান, সফল সমুদ্রপাড়ের শহরগুলো সুশাসন ও ধারাবাহিক নীতির ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক কৌশল গড়ে তোলে, যা চট্টগ্রাম এখনো পারেনি। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চট্টগ্রামের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও নগর ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনও স্বীকার করেছেন যে চট্টগ্রাম নানা সমস্যায় জর্জরিত। তিনি জানান, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও বিদ্যুৎ বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে সিডিএ এবং এখন থেকে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে যুগোপযোগী প্রকল্প প্রণয়ন করা হবে।







