কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী নান্দিয়ার বিলের ইজারা এখনো চূড়ান্ত না হলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো প্রকার দরপত্র বা আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই সেখানে কয়েকশ মণ মাছ অবমুক্ত করেছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিহাদুজ্জামান জিকুসহ স্থানীয় নেতারা। একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যে বিলের অংশীদারত্বও ভাগাভাগি করে নিয়েছেন তারা, যার ফলে অন্তত ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা ও স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে এবং প্রায় দুই বছর বিলটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। এ সময় স্থানীয় জেলে পরিবার ও সাধারণ মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং স্থানীয় বাজারে দেশি ছোট মাছের সরবরাহ বাড়ায় দামও কমেছিল। দীর্ঘ দুই বছর পর বিলটি আবার ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষ ও জেলেদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও স্পষ্ট অসংগতি প্রকাশ পেয়েছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হারুন অর রশিদ দাবি করেছেন, বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপ্রস্তাবের মাধ্যমে একটি মৎস্যজীবী সমিতি বিলটির ইজারা পেয়েছে। তবে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছেন, বিলটি এখনো ইজারা দেওয়া হয়নি এবং আগের টেন্ডার ফল করায় বিষয়টি তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত ও ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই গত ২৬ জুন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিহাদুজ্জামান জিকু ফেসবুকে ‘সরকারি ইজারা পাওয়ার’ ঘোষণা দিয়ে বিলে মাছ অবমুক্ত করার ছবি পোস্ট করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, জিকুর নেতৃত্বে ইতোমধ্যে চুয়াডাঙ্গা থেকে এনে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মণ মাছ বিলে ছাড়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে বিলে নামা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২৮৯ একর আয়তনের এই বিলটি ঘিরে থাকা নান্দিয়া, হাড়ুলিয়া, চাঁনপুর ও ঝাউদিয়াসহ সাত-আটটি গ্রামের বাসিন্দারা এখন বিপাকে পড়েছেন।
ইজারা বণ্টন ও বিলের অংশীদারত্ব নিয়ে বিএনপি নেতাদের নিজেদের বক্তব্যেও পারস্পরিক বিরোধ ও অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। অভিযুক্ত নেতা জিহাদুজ্জামান জিকু নিজেকে কেবল উপস্থিত অতিথি দাবি করে ঝাউদিয়া ও পাটিকাবাড়ি বিএনপির নেতাদের মৎস্যজীবী সমিতি হিসেবে ইজারা নেওয়ার কথা বলেন। তবে ঝাউদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ডা. সাদ আহমেদ ও পাটিকাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা জানান, বিলটি মূলত চালকল মালিক জিকুই কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়েছেন এবং তাদের নেতাকর্মীদের ২৫ শতাংশ করে অংশীদারত্ব বা শেয়ার ভাগ করে দিয়েছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নান্দিয়ার বিলটি ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে আশপাশের ছোট বিল ও জলাশয়েও দেশি মাছের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে। ইজারাদাররা পানি নিষ্কাশনের পথ আটকে মাছ চাষ করায় ডিম ছাড়ার মৌসুমে দেশি মাছ আশপাশের খাল-বিলে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। জেলা প্রশাসকের তথ্যমতে, নান্দিয়ার বিল থেকে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আসত, যা গত দুই বছর বন্ধ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা ও সঠিক টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে রাজনৈতিক প্রভাবে বিল দখল হয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন সরকারের বিশাল রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা ও গ্রামীণ অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে।
