বিপদে পড়লেই রূপ বদলানো, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আবেগকে ঢাল বানিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন বহুরূপী প্রতারক হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস। গতকাল ১২ জুলাই রাতে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে ঢাকার উত্তরা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে। তাঁর গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসছে ধর্ম, নাম আর ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতির সাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হরিদাসের আদি বাড়ি গাইবান্ধায় হলেও একসময় তিনি রাজধানীর উত্তরায় সাধারণ ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন। এর পাশাপাশি পুরোনো এসি কেনাবেচার ছোটখাটো ব্যবসাও ছিল তাঁর। তবে ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ভুয়া ‘প্রটোকল অফিসার’ পরিচয় দেওয়া শুরু করার পর থেকেই মূলত তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে।
এই ভুয়া পরিচয়কে মূলধন করে হরিদাস গড়ে তোলেন সরকারি চাকরি দেওয়া, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের এক বিশাল সিন্ডিকেট। সিআইডি ও র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা সাদা করা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লুকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবেই তিনি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার বিশালাকার এক রামমূর্তি ও মন্দির নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলেন।
স্থানীয়দের মতে, ধর্মীয় এই বড় প্রজেক্টকে সামনে রেখে তিনি বিপুল পরিমাণ চাঁদা ও অনুদান সংগ্রহ করেন। তবে প্রতারণার সাম্রাজ্য যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে আসেন, তখনই হরিদাস তাঁর অপরাধের ট্র্যাক রেকর্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং হন্যে হয়ে খোঁজা পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচতে রাতারাতি সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে নাম বদলে হয়ে যান ‘তাওহীদ’। নাম বদলালেও পর্দার আড়ালে তাঁর তদবির বাণিজ্য ও হুন্ডি ব্যবসা চালু ছিল পুরোদমেই।
এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরেও র্যাবের হাতে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন হরিদাস। তখন তাঁর নামে ৪ কোটি টাকাসহ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধান মিলেছিল। পরবর্তীতে জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি আবারও একই চক্র সক্রিয় করেন। সিআইডি জানিয়েছে, হরিদাসের বিরুদ্ধে শুধু দেশীয় প্রতারণাই নয়, বরং অবৈধ উপায়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ মিলেছে।
রামমূর্তি নির্মাণের নায়ক থেকে ‘তাওহীদ’ বনে যাওয়া এই বহুরূপী প্রতারকের গ্রেফতারের পর গাইবান্ধা ও পলাশবাড়ী এলাকার ভুক্তভোগীদের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। সিআইডি বর্তমানে এই চক্রের বাকি সদস্যদের ধরতে এবং পাচার হওয়া অর্থের সন্ধানে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।
