আজ (২৫ জুলাই) পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। পানিতে ডুবে মৃত্যুর মতো প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। এসব মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। শিশু ও কিশোরদের অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও এটি।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা, সাঁতার শিক্ষা এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এসব দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার গড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঘানার রাজধানী আক্রায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব সম্মেলনে ডব্লিউএইচও ‘PROTECT’ নামে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সাতটি প্রমাণভিত্তিক কৌশলসম্বলিত একটি নতুন কারিগরি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়, এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিরও বড় বাধা। তাই এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্মেলনে ঘানার উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবেনেজা ক্লুতে টেলাবি বলেন, বিশ্বজুড়ে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের অকালমৃত্যুর শীর্ষ ১০টি কারণের একটি হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু। নদী, হ্রদ, পুকুর, উন্মুক্ত কূপ, গৃহস্থালির পানির পাত্র এবং সুইমিংপুলে প্রতিদিন বহু শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। বন্যা ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ায় এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, পানিতে ডুবে প্রতিটি মৃত্যুই হৃদয়বিদারক এবং এর বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য। ডব্লিউএইচওর সাতটি কৌশল দেশগুলোকে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। নিরাপদ নৌযান নিশ্চিত করা, শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা জোরদার করাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে করণীয়
শিশুদের পানির ধারে কখনো একা যেতে না দেওয়া।অল্প বয়স থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা।
লাইফগার্ড বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে—এমন স্থানে সাঁতার কাটা।নদী, খাল বা পুকুরে চলাচলের সময় লাইফজ্যাকেট ব্যবহার করা।
দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে সাঁতার শিক্ষা চালু করা, স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ জলাধার গড়ে তোলা এবং ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
