দ্য টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান শনাক্ত করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ। দুই সংস্থাই যৌথভাবে এবং আলাদাভাবে তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে না আসা এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তাদের অভিযান জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তার বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনি আর প্রকাশ্যে আসেননি। ওই হামলায় তিনিও আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নানা ধরনের তথ্য প্রকাশ পেলেও কোনোটিই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি হালকা বা মাঝারি ধরনের আহত হলেও নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছেন। আবার অন্য কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তার মুখমণ্ডলে বিকৃতি এসেছে। এমনকি ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের অন্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোই কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনা করছে বলেও দাবি উঠেছে।
দ্য টাইমসের ভাষ্য অনুযায়ী, মোজতবার দীর্ঘ নীরবতাই তাকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিনি ১৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি এবং কোনো ল্যাপটপও খোলেননি। তিনি একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও দাবি করা হয়েছে, হামলায় আহত হওয়ার কারণে তার মুখমণ্ডলে পরিবর্তন এসেছে এবং দিনের বেলায় তিনি বাঙ্কার থেকে বের হন না। কারণ মার্কিন গোয়েন্দা উপগ্রহের নজরদারিতে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোজতবার বাবা জীবিত থাকাকালে তাকে শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভাব্য বিভিন্ন সাইবার কৌশল ব্যবহার করেছিল। তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করে খামেনির নিরাপত্তা বহরের গাড়ি শনাক্ত করার তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দাবি করা হয়েছে, ওই তথ্যের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) এবং ইসরায়েলের ইউনিট ৮২০০ খামেনি ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের অবস্থান জানতে সক্ষম হয়েছিল। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে হামলা চালানো হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মোজতবার ক্ষেত্রে আগের কৌশল কার্যকর হচ্ছে না। প্রযুক্তিগত নজরদারি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখায় এখন মোসাদ ও সিআইএ মূলত মানব গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ ইরানের ভেতরের তথ্যদাতা ও গুপ্তচরদের মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
দ্য টাইমস আরও দাবি করেছে, গোয়েন্দা মহলের একটি অংশের ধারণা, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাতেই মোজতবা খামেনি নিহত হয়েছেন অথবা পরে আঘাতের কারণে মারা গেছেন। তবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড রাজনৈতিক কারণে তাকে জীবিত বলে প্রচার করছে। যদিও এ দাবিরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোসাদ ও সিআইএ এখন নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে তিনি আদৌ জীবিত কি না। যদি জীবিত থাকেন, তাহলে তিনি তেহরানের কোনো ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে অথবা রাজধানী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কোম শহরের কাছে একটি সামরিক বাঙ্কারে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র ধারণা করছে।
মোসাদের সাবেক বন্দি ও নিখোঁজবিষয়ক বিভাগের প্রধান রামি ইগ্রা দ্য টাইমসকে বলেন, মোজতবা ফোন ব্যবহার না করলেও তিনি নিশ্চয়ই অন্য কোনো উপায়ে যোগাযোগ করছেন। তার মতে, কাগজে লেখা বার্তা একাধিক বার্তাবাহকের মাধ্যমে আদান-প্রদান হতে পারে এবং তাকে খুঁজে বের করার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো মানব গোয়েন্দা তথ্য।
রামি ইগ্রা আরও বলেন, অতীতে আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের অবস্থানও তার এক বার্তাবাহককে অনুসরণ করেই শনাক্ত করা হয়েছিল। মোজতবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মোসাদের সাবেক আরেক কর্মকর্তা আভনার আব্রাহামের দাবি অনুযায়ী, মোজতবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার মতো দেখতে একাধিক ব্যক্তিকে ব্যবহার করছে ইরান। এতে তার প্রকৃত অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
হত্যা বা হামলার আশঙ্কার কারণেই মোজতবা খামেনি তার বাবার জানাজা ও দাফান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিল। এরপর থেকে তার কণ্ঠে কোনো অডিও বা ভিডিও বার্তা প্রকাশ হয়নি। শুধু তার নামে লিখিত কিছু বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে।
দ্য টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, নতুন ইরানি নেতাকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে মানব গোয়েন্দা তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে গত চার দশক ধরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সীমিত থাকায় এ ক্ষেত্রে সিআইএর সক্ষমতা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তার মতে, ইসরায়েলের মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী। ফলে মোজতবা খামেনিকে খুঁজে বের করার অভিযানে মোসাদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনটির শেষাংশে সাবেক এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, যদি কখনো মোজতবার অবস্থান নিশ্চিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটি নির্ভর করবে সম্ভাব্য পরবর্তী নেতৃত্বের ওপর। কারণ নতুন নেতৃত্ব ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে কী ভূমিকা রাখবে, সেটিও বিবেচনায় থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
