কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন শুধু নিজের জীবনকে অর্থময় করার জন্য নয়; তাঁরা তাঁদের সময়কে কিছু দিয়ে যাওয়ার জন্য আসেন। তাঁদের জীবন শেষ হয়, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া শব্দ, সুর, স্বপ্ন ও সাংস্কৃতিক সাধনা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়। মতিউর রহমান মল্লিক তেমনই একজন ক্ষণজন্মা কবি। তাঁর মৃত্যু হয়েছে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট; কিন্তু তাঁর কবিতা, গান ও সাংস্কৃতিক চিন্তা আজও বাংলা সাহিত্য ও ইসলামী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক স্বতন্ত্র অনুরণন সৃষ্টি করে চলেছে। আজ তাঁর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা তাই নিছক আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়; বরং ইসলামী সংস্কৃতির জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ কবি ও সংস্কৃতিসাধকের জীবন ও কর্মের কাছে ফিরে যাওয়া।
মতিউর রহমান মল্লিক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৪ সালের ১ মার্চ, বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে। তাঁর সাহিত্যিক হয়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর পিতা মুন্সি কায়েম উদ্দিন মল্লিক ছিলেন স্থানীয় কবি ও জারিগানের রচয়িতা। মা আছিয়া খাতুন ছিলেন বিদুষী নারী। ফলে শৈশবেই তিনি এমন এক পরিবেশ পেয়েছিলেন, যেখানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বারুইপাড়া সিদ্দীকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় সম্পন্ন করার পর তিনি বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর কবিসত্তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বিশ্বাস ও মানবতার এক অনন্য সমন্বয়। তিনি কবিতাকে নিছক বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখেননি। তাঁর সাহিত্যভাবনায় কবিতা ছিল সত্য, সুন্দর ও মানবিক জাগরণের বাহন। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর গান ও কবিতার মাধ্যমে মানুষ সত্য ও সুন্দরের পথে জেগে উঠুক। তাঁর লেখায় তাই একদিকে যেমন ছিল দ্রোহের আগুন, অন্যদিকে ছিল ভালোবাসা ও মমতার ফল্গুধারা। শোষণ, বঞ্চনা ও মানুষের হাহাকারহীন একটি সমাজের স্বপ্ন তাঁর সৃষ্টির অন্তর্গত প্রেরণার অন্যতম উৎস ছিল।
এই জায়গাটিই মতিউর রহমান মল্লিককে বিশেষভাবে আলাদা করে। তিনি ইসলামী মূল্যবোধকে কেবল ধর্মীয় বক্তব্যের কাঠামোয় আবদ্ধ রাখেননি; বরং কবিতা, গান ও সংস্কৃতির নান্দনিক ভাষায় তাকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে বিশ্বাস ছিল জীবনের অন্তর্গত সৌন্দর্য, আর সাহিত্য ছিল সেই সৌন্দর্যকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। এ কারণে তাঁর সাহিত্যকর্মে একই সঙ্গে পাওয়া যায় আত্মজিজ্ঞাসা, প্রকৃতিপ্রেম, মানবিক আবেদন, নৈতিক প্রত্যয় এবং স্রষ্টার প্রতি গভীর আস্থা।
মতিউর রহমান মল্লিক শুধু কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠক। ১৯৭৮ সালে ঢাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। তাঁর জীবনীতে সংগঠনটিকে বাংলাদেশের সুস্থ ধারার সংস্কৃতিচর্চার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ছিল তাঁর সাংস্কৃতিক স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
একজন কবির কলম যতটা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে, গান কখনো কখনো তার চেয়েও বহুদূর যেতে পারে—মল্লিক সম্ভবত এই সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি কবিতার পাশাপাশি গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। তাঁর গানের বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সুর-শিহরণ’, ‘যত গান গেয়েছি’, ‘ঝংকার’, ‘কেমন আছো’ এবং ‘প্রাণের ভিতরে প্রাণ’। তাঁর কাব্যগ্রন্থের তালিকায় রয়েছে ‘নীষন্ন পাখির নীড়ে’, ‘আবর্তিত তৃণলতা’, ‘তোমার ভাষায় তীক্ষ্ণ ছোরা’, ‘পাথর ও পাখির গান’, ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ এবং ‘চিত্রল প্রজাপতি’।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, মাসিক কলম-এর সম্পাদক এবং বিপরীত উচ্চারণ সাহিত্য সংকলনের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্যকর্ম কেবল ব্যক্তিগত সৃজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি একটি বৃহত্তর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছিলেন।
তাঁর সাংগঠনিক কর্মপরিধিও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রে তিনি দীর্ঘ সময় নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ফলে তাঁকে শুধু কবিতার পৃষ্ঠায় আবদ্ধ করে দেখলে তাঁর সামগ্রিক অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে কবি, গীতিকার, সম্পাদক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং একটি সাংস্কৃতিক দর্শনের ধারক।
তাঁর সাহিত্যিক স্বীকৃতির কথাও উল্লেখযোগ্য। জীবনীতে তাঁর অর্জিত সম্মাননার মধ্যে রয়েছে জাতীয় সাহিত্য পরিষদ স্বর্ণপদক, কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (ফ্রান্স) এবং সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী আজীবন সম্মাননা। ২০০২ সালে তিনি জাতীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন।
পদক একটি সময়ের স্বীকৃতি; কিন্তু পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা। মতিউর রহমান মল্লিকের জীবন ও কর্মের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানেই—তিনি এমন একটি পাঠক ও শ্রোতৃসমাজের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, যারা তাঁর কবিতা ও গানকে কেবল শিল্পকর্ম হিসেবে নয়, জীবনবোধের অংশ হিসেবেও গ্রহণ করেছে।
তাঁর একটি বক্তব্য ‘সত্যের পথে চলাই হলো সবচেয়ে বড় বিপ্লব’ তাঁর সাহিত্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে যেন সংক্ষেপে ধারণ করে। সত্য, সৌন্দর্য ও মানবতার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কাছে সংস্কৃতি ছিল জাতির আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ বাহন; তাই সংস্কৃতিকে হারানো মানে কেবল কিছু গান-কবিতা হারানো নয়, বরং জাতিসত্তার একটি অংশকে দুর্বল করে দেওয়া।
জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল সংগ্রামের। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ঢাকায় ৫৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও তাঁর অনুরাগীদের কাছে অনুভবযোগ্য।
কিন্তু মৃত্যু তো সবসময় একজন স্রষ্টার শেষ নয়। কখনো কখনো মৃত্যুই তাঁর সৃষ্টির দ্বিতীয় জীবনের সূচনা করে। জীবদ্দশায় যে কবিকে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিসরের মানুষ বেশি পড়েছেন, সময়ের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির সামনে আরও বিস্তৃত পাঠকের দরজা খুলতে পারে। মল্লিকের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের চলে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন যদি মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় পায়, তাঁর গান যদি কোনো তরুণের কণ্ঠে ফিরে আসে, তাঁর কোনো পঙ্ক্তি যদি কোনো ক্লান্ত মানুষকে আবার সত্য ও সুন্দরের পথে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, তবে সেই কবির মৃত্যু সম্পূর্ণ মৃত্যু নয়।
আজ ১৬ বছর পরও তাই তাঁকে মনে হয়—বাংলা কবিতার আকাশে নিভে যাওয়া কোনো নক্ষত্র নন; বরং এমন এক আলো, যার উৎস চোখের আড়ালে, কিন্তু যার দীপ্তি এখনো অনুভব করা যায়।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক—শব্দের মানুষ, সুরের মানুষ, বিশ্বাসের মানুষ। তিনি মহান রবের দরবারে সসম্মানে ফিরে গিয়েছেন; কিন্তু তাঁর কবিতা, তাঁর গান এবং তাঁর সাংস্কৃতিক স্বপ্ন এখনো মানুষের হৃদয়ে উচ্চারণ হয়ে বেঁচে আছে সমহিমায়।
তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তাঁর সাহিত্যসাধনা, সাংস্কৃতিক প্রয়াস ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কল্যাণকর কর্মগুলো কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।







