বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইকের সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি তথ্য না থাকলেও এটি বর্তমানে একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি সংস্থার ধারণা অনুযায়ী, দেশে এজাতীয় যানবাহনের সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ এবং সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমানে ৬০ লাখের বেশি ইজিবাইক চলাচলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিপুলসংখ্যক থ্রি-হুইলারের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও বেশ বিশাল। যদি ৫০ লাখ অটোরিকশা প্রতিদিন গড়ে সর্বনিম্ন ৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তবে রিচার্জের জন্য দৈনিক ৩৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। তবে সব গাড়ি একই সময়ে বা সমপরিমাণ চার্জ না নেওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর এর প্রভাব সময়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে ওঠা এই বৈদ্যুতিক পরিবহনব্যবস্থাটি মূলত স্থানীয় কারিগর ও চালক-মালিকদের প্রয়োজনে বিস্তৃত হয়েছে। দেশীয় গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০০ শতাংশের বেশি ই-রিকশা স্থানীয়ভাবে তৈরি এবং এগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তায় চীনা মোটর ও সীসা-অম্ল (লিড-অ্যাসিড) ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। সাশ্রয়ী ভাড়া ও সহজ যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে গ্রাম ও শহরের ভেতরের যোগাযোগে এটি এখন সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান বাহন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনকে ‘বাংলা টেসলা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
কারিগরি দিক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার মূল সমস্যা দেখা দেয় চার্জিংয়ের সময়সূচি ও স্থানে। বেশিরভাগ অটোরিকশা দিনের বেলা চলাচলের পর সন্ধ্যা বা রাতে একযোগে চার্জে দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ও সাবস্টেশনগুলোতে হঠাৎ চরম চাপ তৈরি হয়, বিশেষ করে বাণিজ্যিক বা গৃহস্থালি লাইন থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চার্জ দেওয়ার ফলে দুর্ঘটনা ও লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা এই পরিবহন খাতকে কেবল বিদ্যুৎ সংকটের কারণ হিসেবে না দেখে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার তাগিদ দিচ্ছেন। তাঁরা মনে করছেন, লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ও যাতায়াতের সাথে যুক্ত এই যানগুলোকে একবারে বন্ধ করা অবাস্তব। বরং চার্জিং স্টেশনগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় এনে বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ সঞ্চয়ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুললে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবহন খাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব।
একই সাথে ব্যাটারির পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশে ব্যবহৃত বেশিরভাগ সীসা-অম্ল ব্যাটারির মাত্র ২০ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাটারির বিষাক্ত সীসা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক ও দৈহিক বিকাশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও এই সীসা দূষণের বিষয়ে সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে, এই বিশাল গণপরিবহন খাতের টেকসই সমাধানের জন্য নিষেধাজ্ঞার বদলে সমন্বিত নীতিমালার প্রয়োজন। অটোরিকশার সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন, রাতভিত্তিক চার্জিংয়ের সময়সূচি নির্ধারণ, সময়োপযোগী চার্জিং স্টেশন নির্মাণ, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পুরাতন ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের বাধ্যতামূলক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ইজিবাইক খাতকে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রূপ দেওয়া সম্ভব।







