আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে করা তিনটি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের বন্দর, নৌপথ ও স্থলপথ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে ভারত। ফলে দেশের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চুক্তিগুলো হলো—চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া (ACMP), কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট (CSA) এবং প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (PIWTT)।
এর মধ্যে PIWTT পুরোনো চুক্তির নবায়ন হলেও ACMP ও CSA নতুন করে করা হয়। সমালোচকদের দাবি, এসব চুক্তির ফলে ভারতের জন্য বাংলাদেশের বন্দর ও নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও এর বিপরীতে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের সুবিধা পায়নি।
CSA-এর আওতায় চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও পানগাঁও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে ACMP-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌ ও স্থলপথ ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়। PIWTT-এর আওতায় নির্ধারিত নৌপথে ভারতের জাহাজ চলাচলের জন্য নাব্যতা বজায় রাখার দায়িত্বও বাংলাদেশের ওপর পড়ে। চুক্তিটিতে পাঁচ বছর পরপর স্বয়ংক্রিয় নবায়নের ব্যবস্থাও রয়েছে।
২০১৫ সালের ৬ জুন চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। পরে ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর ACMP স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আন্তঃসরকারি কাঠামো পায়। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর চুক্তি বাস্তবায়নের বিস্তারিত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) সই হয়। ২০২০ সালে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় পরীক্ষামূলক কনটেইনার পরিবহনও করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথক উদ্দেশ্যে করা হলেও তিনটি চুক্তি সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের নৌ ও স্থলবাণিজ্যে ভারতের প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দর ও বাণিজ্যিক রুট ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ভারতের ভূখণ্ডে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের সুবিধা পেয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পরও চুক্তিগুলো বাতিল বা পুনর্মূল্যায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব কার্যক্রম কিছুটা ধীর হলেও বর্তমানে ভারত আবার চুক্তিগুলোর আওতায় কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে ভারত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সফর হলে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি এসব চুক্তির আওতায় কার্যক্রম পুনরায় জোরদারের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আলোচনা হতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, শেখ হাসিনার আমলে করা তিনটি চুক্তিই বিতর্কিত এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চুক্তিগুলো প্রকাশ্যে এনে পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তিগুলো সংসদে উপস্থাপন করে বিস্তারিত আলোচনা এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা।
