সাত মাসে ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজের জিডি- সংখ্যাটি একনজরে বিশ্বাস করাই কঠিন। কিন্তু আরও ভয়ংকর হলো, এই বিশাল সংখ্যার কতজন শিশু পরে ফিরে এসেছে, কতজন এখনো নিখোঁজ, কিংবা কতজন মানবপাচার ও অপরাধের শিকার হয়েছে- তার কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব রাষ্ট্রের কাছে নেই।
একাত্তর টিভির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। হিসাব করলে দেখা যায়, মাসে গড়ে প্রায় ২ হাজার ১৪৩টি এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০টি জিডি হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতি ২০ থেকে ২১ মিনিটে দেশের কোথাও না কোথাও একটি শিশু হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থানায় জমা পড়ছে।
অবশ্য ১৫ হাজার জিডি মানেই ১৫ হাজার শিশু স্থায়ীভাবে নিখোঁজ- এমনটি নয়। অনেক শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর পরিবার তাকে খুঁজে পায় বা শিশুটি নিজে থেকে বাড়ি ফিরে আসে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে শিশু উদ্ধার হলেও পরিবার তা থানায় অবহিত করে না। ফলে কাগজের জিডি জোড়ালো থাকলেও সরকারি ডেটাবেসে শিশুর প্রকৃত পরিণতি যুক্ত হয় না।
বাস্তবতায় একজন শিশু নিখোঁজ হওয়া মানে সে মানবপাচার, শিশুশ্রম, শারীরিক নির্যাতন ও যৌন শোষণের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়া। বিশেষ করে নিখোঁজের প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন টাইম’ উদ্ধার অভিযানে অত্যন্ত জরুরি। তবে দেখা যাচ্ছে থানাকেন্দ্রিক জিডি, সিআইডির কাজ এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়হীনতার কারণে সঠিক সময়ে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ (UNICEF) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য, শিশুবিয়ে ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির কারণে শিশুরা পাচারের ঝুঁকিতে থাকে। নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত মানবপাচারের শিকার হলেও সরকারিভাবে অনুসন্ধানের অভাবে তা আড়ালেই থেকে যায়।
এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সহিংসতায় ১৯৫ জন শিশু নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৩০টি ঘটনা ছিল নিখোঁজ হওয়া শিশুর মরদেহ উদ্ধারের। কিন্তু অজ্ঞাত মরদেহের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ তালিকার সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের কেন্দ্রীয় ডেটাবেসের ক্রস-ম্যাচ না হওয়ায় শেষ পরিণতি প্রায়ই রাষ্ট্র বা পরিবারের চোখের আড়ালে থেকে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সমন্বিত জাতীয় ‘Missing Child Database’ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। থানায় হওয়া জিডি, মর্গের অজ্ঞাত দেহ, সিআইডি ও বিভিন্ন শিশু সুরক্ষা সংস্থার তথ্য এক ছাতার নিচে না আনলে দেশের শিশুদের নিরাপত্তার এই চরম সংকট নিরসন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।







