তুরস্কের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রুহি চেনেট সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী একটি হাসিদিক ইহুদি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট সিক্রেটিভ জিউইশ কমিউনিটি: হাসিদিকস’ শিরোনামের এই ডকুমেন্টারিতে তিনি ওই সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় কাটিয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবন, ধর্মীয় অনুশাসন, পরিবারব্যবস্থা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন তুলে ধরেছেন।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ডকুমেন্টারিতে যে জীবনযাত্রার চিত্র উঠে এসেছে, সেটি সব ইহুদির জীবনযাত্রাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এটি মূলত হাসিদিক বা আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের জীবন ও বিশ্বাস নিয়ে নির্মিত।
নিউইয়র্কের মতো আধুনিক মহানগরের মধ্যেই এসব সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ তুলনামূলকভাবে আলাদা সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে জীবনযাপন করেন। তাদের পোশাক, পারিবারিক জীবন, শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে কঠোর নিয়মকানুনের প্রভাব রয়েছে।
ডকুমেন্টারির আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। সম্প্রদায়ের কিছু অংশ ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করে। এর পেছনে মূল যুক্তি হলো—প্রযুক্তি ও বাইরের বিশ্বের অতিরিক্ত যোগাযোগ ধর্মীয় জীবন ও পারিবারিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে কিছু সদস্য সাধারণ বা সীমিত সুবিধার ফোন ব্যবহার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট থেকে দূরে থাকার প্রবণতাও রয়েছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাত্রা সব হাসিদিক গোষ্ঠীতে একই নয়; সম্প্রদায়ভেদে নিয়মের পার্থক্য রয়েছে।
ডকুমেন্টারিতে বাইরের জনপ্রিয় সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সীমিত যোগাযোগের বিষয়টিও উঠে আসে। ফলে বিশ্বের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, বিনোদন জগত কিংবা সমসাময়িক সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেকের জ্ঞান সাধারণ মানুষের তুলনায় সীমিত থাকতে পারে।
পরিবার ও সন্তানসংখ্যাও তথ্যচিত্রটির অন্যতম আলোচিত বিষয়। সেখানে কয়েকটি পরিবারের ক্ষেত্রে গড়ে প্রায় ১০ সন্তানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। হাসিদিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় পরিবারকে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করার প্রবণতা রয়েছে।
সন্তান নেওয়া ও পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে ধর্মীয় নেতার পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই উচ্চ জন্মহারের পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ঐতিহাসিক কারণের কথাও আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টে ইউরোপের ইহুদি জনগোষ্ঠীর ব্যাপক প্রাণহানির পর কিছু অতি-ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় পরিবার গড়ে তোলার প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে বলে ডকুমেন্টারি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু পারিবারিক জীবন নয়, নিজেদের সামাজিক কাঠামোর দিক থেকেও এই সম্প্রদায়গুলো আলাদা। কিছু হাসিদিক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা দল, নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ধর্মীয় আদালত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় পুলিশ বা আদালতের বিকল্প নয়; বরং সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ সহায়তা ও ধর্মীয় কাঠামোর অংশ।
কিছু এলাকায় ‘Shomrim’ বা ‘Shmira’ নামে স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা দলও কাজ করে। তারা বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা করে এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে।
ধর্মীয় বিধি-বিধান তাদের পোশাক ও সামাজিক আচরণেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নারী-পুরুষের পোশাক, পারিবারিক সম্পর্ক, শাবাত পালনের নিয়ম এবং বাইরের সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কঠোর অনুশাসন রয়েছে।
হাসিদিক ইহুদিবাদ মূলত ১৮ শতকে পূর্ব ইউরোপে গড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় আন্দোলন। বর্তমানে এটি হেরেদি বা আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারার সঙ্গে যুক্ত। নিউইয়র্ক, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের বড় সম্প্রদায় রয়েছে।
রুহি চেনেটের তথ্যচিত্র প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে প্রযুক্তিবিমুখতা, বড় পরিবার, ধর্মীয় অনুশাসন এবং নিজেদের আলাদা সামাজিক কাঠামোকে ঘিরে।
তবে ডকুমেন্টারির এসব বিষয়কে পুরো ইহুদি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সাধারণ চিত্র হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপিত হবে। বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জীবনধারা, বিশ্বাস ও সামাজিক কাঠামো নিয়ে নির্মিত একটি অনুসন্ধানী ভিডিও হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
