ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (পিসিএ)। সোমবার দেওয়া এই সিদ্ধান্তে আদালত বলেছে, চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার একতরফা ক্ষমতা ভারতের নেই।
পিসিএর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। চুক্তির আওতায় ভারতের যে বাধ্যবাধকতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দেশটিকে মেনে চলতে হবে বলেও জানিয়েছে আদালত।
পাকিস্তানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধপূর্ণ রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা দিয়েছে পিসিএ।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট উচ্চতার ওপরে রাটলে প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশের কাঠামোয় কংক্রিটের কিছু কাজ করা যাবে না।
এই নিষেধাজ্ঞা বিশ্বব্যাংক নিয়োগ করা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর ৯০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিসিএর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। ইসলামাবাদ এটিকে দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশের পর সেটি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় করা এই চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলের রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার ভারতের জন্য নির্ধারিত।
অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব নদীর পানি মূলত পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারতও পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পানির সীমিত ব্যবহার করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, নদীর পানি প্রবাহ ও বাঁধ নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের পর পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়। ভারত ওই সময় একতরফাভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি ‘স্থগিত’ করার ঘোষণা দেয়।
ভারতের এই অবস্থানের বিপরীতে পাকিস্তান চুক্তিটি কার্যকর রয়েছে বলে দাবি করে আসছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেয় ইসলামাবাদ।
সোমবারের রায়ে পিসিএ মূলত চুক্তির কার্যকারিতা ও সংশ্লিষ্ট বাধ্যবাধকতার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কিছু নির্মাণকাজে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তবে আদালতের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পিসিএর এই সালিশি কার্যক্রমের এখতিয়ার স্বীকার করে না। নয়াদিল্লির দাবি, ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ার এই আদালতের নেই।
ভারত আরও জানিয়েছে, তারা এই কার্যক্রমে লিখিত বা মৌখিক কোনোভাবেই অংশ নেয়নি।
ফলে পিসিএর রায়কে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান আবারও মুখোমুখি হয়েছে। পাকিস্তান যেখানে এটিকে চুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে, ভারত সেখানে আদালতের এখতিয়ারই অস্বীকার করছে।
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে পিসিএর এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
