পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পাঞ্জাব প্রদেশে একটি মাদ্রাসার পরিধি বাড়ানোর জন্য প্রায় ১২৫ বছরের পুরনো একটি হিন্দু মন্দির ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন দেশটির অধিকারকর্মী, সংখ্যালঘু সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
লাহোর থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে নারোওয়াল জেলার সিরাজ গ্রামে মন্দিরটির অবস্থান। প্রায় ১ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর থাকা স্থাপনাটি ১০০ থেকে ১২৫ বছরের পুরনো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২১ আগস্ট একদল লোক মন্দিরটি ধ্বংস করে। তাদের বিরুদ্ধে পাশের একটি মাদ্রাসা সম্প্রসারণের জন্য মন্দিরটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত কট্টরপন্থি ইসলামী দল তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তানের (টিএলপি) সদস্যরাও ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে মন্দিরটি পরিকল্পিতভাবে ভাঙা হয়েছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান সরকার। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভারী বৃষ্টির কারণে পুরনো স্থাপনাটি ধসে পড়েছে।
মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ এবং এর জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সংখ্যালঘু সংগঠন ও একটি রাজনৈতিক দল।
সংখ্যালঘুদের অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মাসিহা মিল্লাত পার্টির (পিএমএমপি) চেয়ারম্যান আসলাম পারভেজ সাহোত্রা এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণেরও দাবি জানিয়েছেন।
সাহোত্রা জানান, গত ২৮ আগস্ট তিনি পাঞ্জাবের অতিরিক্ত স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন।
আবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মন্দিরটি রক্ষায় ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সাহোত্রার অভিযোগ, মন্দিরটি ধ্বংসের পর এর শিখরের ধাতব অংশ, ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, মন্দিরের পাশের জমি আগে সরকারি সংস্থা ইভাকুই ট্রাস্ট প্রপার্টি বোর্ডের (ইটিপিবি) মাধ্যমে একটি মাদ্রাসার জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল।
তবে বছরের পর বছর ভাড়া বকেয়া থাকা এবং নির্ধারিত উদ্দেশ্যে জমি ব্যবহার না করায় পরবর্তীতে ওই ইজারা বাতিল করা হয় বলে জানান সাহোত্রা।
রাজস্ব বিভাগের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, কয়েকজন ব্যক্তি মন্দিরের কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন অংশ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন।
সাহোত্রার ভাষ্য, ইটিপিবির শিয়ালকোট কার্যালয় গত ২৯ জানুয়ারি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং সম্পত্তি সিলগালা করার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
তিনি মন্দিরটিকে মূল রূপে পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি পাঞ্জাবের হিন্দু মন্দির, শিখদের গুরুদুয়ারা ও খ্রিস্টানদের গির্জার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মন্দিরটি ধ্বংসের অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা রতন লাল।
তার দাবি, জেলা প্রশাসন ও ইটিপিবি মন্দিরটি রক্ষা কিংবা অবৈধ দখলদারদের সরাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। এর ফলেই শেষ পর্যন্ত মন্দিরটি ধ্বংসের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নারোওয়াল জেলা শান্তি কমিটি ও পাক ধর্ম আস্থান হিন্দু কমিটির সদস্য রতন লাল আরও বলেন, মাদ্রাসা চালু থাকায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিরাপত্তার আশঙ্কায় মন্দির চত্বরে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
তবে অভিযোগকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে সরকারের বক্তব্যের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
ইটিপিবির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রানা ইফতিখার বলেন, মন্দিরটি প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ বছরের পুরনো ছিল এবং মুষলধারে বৃষ্টির কারণেই এটি ধসে পড়ে।
তার ভাষ্য, সরকারি নথিতে স্থাপনাটির কোনো নাম উল্লেখ নেই। তবে এটি অত্যন্ত পুরনো একটি স্থাপনা ছিল বলে তিনি স্বীকার করেন।
যদিও গত ১১ এপ্রিলের একটি পুলিশ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, স্থানীয় পুলিশ আগে থেকেই মন্দিরটির নিরাপত্তাঝুঁকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে অবগত ছিল।
ইফতিখার আরও স্বীকার করেন, মন্দিরের সংলগ্ন জমি একটি মাদ্রাসার জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তবে তার দাবি, মন্দিরের মূল জমি কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে ইটিপিবির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
মন্দিরটি কীভাবে ধ্বংস হয়েছে, সেটি নিয়ে অভিযোগ ও সরকারি বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
