বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মধ্যেই র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
বিল পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানিয়ে বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করে কার্যত একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। তাদের ভাষায়, এটি শুধু ‘সাইনবোর্ড পরিবর্তন’ এবং ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’।
২০০৩ সালে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স’ সংশোধনের মাধ্যমে র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। শুরুতে বাহিনীটির কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও পরবর্তী সময়ে ‘ক্রসফায়ার’, ‘গুম’সহ বিভিন্ন অভিযোগে এটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। নতুন আইনের মাধ্যমে ওই অর্ডিন্যান্স থেকে র্যাব-সংক্রান্ত বিধান বাদ দিয়ে পৃথক এসআরবি আইন করা হয়েছে।
একই দিনে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল–২০২৬’ও সংসদে পাস হয়েছে।
দুটি বিলই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে উত্থাপন করেন। বিল দুটির ওপর জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে সেগুলো পাস হয়।
গত ৩ সেপ্টেম্বর ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল–২০২৬’ সংসদে উত্থাপনের সময়ও বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছিল। সংসদীয় কমিটির আলোচনায় তারা বিলটির আটটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়।
বিরোধী দলের আপত্তি
বিলের ওপর আলোচনায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল যথেষ্ট আলোচনা ছাড়া মাত্র চার কর্মদিবসের মধ্যে পাসের জন্য সংসদে আনা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বিলটি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা এবং অভিযোগ প্রতিকার কমিটির কার্যকারিতা যাচাইয়ের দাবি জানান। পাশাপাশি সাবেক একজন বিচারপতির নেতৃত্বে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
বিরোধী দলের আরেক সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, র্যাব বিলুপ্তির দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে করা হয়েছে। জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও গুম কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এসআরবি আইনের ২৭ ধারায় র্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি ও দায়-দায়িত্ব নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। ফলে এটি মূলত শুধু নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ।’
নাজিবুর রহমানের আশঙ্কা, র্যাবের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুম ও অন্যান্য অপরাধের মামলা এবং তদন্তও এতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
‘শুধু বিলুপ্তির দাবি ছিল’
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, র্যাব বিলুপ্তির দাবি ছিল সর্বমহলের। বেগম খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাও এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘এটা বিলুপ্ত করে আরেকটা বাহিনী গঠনের দাবি কারওই ছিল না। শুধু বিলুপ্তির দাবি ছিল।’
শফিকুর রহমানের অভিযোগ, র্যাবের জনবল, স্থাপনা ও লজিস্টিকস বহাল রেখে নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় র্যাব সদস্যদের উপস্থিতির অভিযোগও দেখিয়ে দেয় যে বাহিনীর সদস্যদের আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
তিনি বলেন, জনগণের কাছে এসআরবির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করতে হবে এবং এ ধরনের একটি বিশেষায়িত বাহিনী কেন প্রয়োজন, সে বিষয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করতে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা আইনটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার বিলটি ফিরিয়ে নিক এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা করে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হোক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল র্যাব বিলুপ্ত করা, সরকার সেটিই করছে। তবে বিল পাসে দেরি হলে র্যাবের অস্তিত্ব আরও দীর্ঘায়িত হবে।
তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটিতে বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও বিলটি দীর্ঘদিন প্রকাশিত ছিল এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে।
র্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বাহিনী গঠনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘র্যাব আমরা বিলুপ্ত করেছি, আজকে যদি পাস হয়। তারপরে আমরা একটা নতুন ব্যাটালিয়ন রেইজ করছি। সেই ব্যাটালিয়নের নাম হবে এসআরবি। র্যাবের সঙ্গে এটার কোনো সংস্পর্শ নেই।’
তবে তিনি জানান, র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ রাষ্ট্রীয় সম্পদ নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। তাঁর মতে, এসব সম্পদ রাষ্ট্রীয় সম্পদ হওয়ায় সেগুলো সংরক্ষণ ও যথাযথভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।
এসআরবির ক্ষমতা ও কাঠামো
পাস হওয়া বিলে পুলিশ বাহিনীর অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা হবে।
এসআরবির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি এবং চাকরির শর্ত বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ইউনিটের নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও পোশাক থাকবে। এর মহাপরিচালক হবেন পুলিশের কর্মরত একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বিলে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, নথিপত্রসহ বিভিন্ন সম্পদ ও দায়িত্ব এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত ২০০৫ সালের বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী র্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আদালতের কার্যক্রম বহাল রাখার কথাও বলা হয়েছে।
এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে।
নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এই কমিটির সভাপতি হবেন।
এপিবিএনের নতুন ক্ষমতা
অন্যদিকে, পাস হওয়া ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল–২০২৬’-এ পুলিশ বাহিনীর অধীনে এপিবিএন গঠন ও পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। এর আওতায় স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নসহ অন্যান্য ব্যাটালিয়ন থাকবে।
নতুন আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইন মেনে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও থাকবে ইউনিটটির।
এ ছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এপিবিএনের কোনো সদস্য সংবাদমাধ্যম বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কোনো তথ্য বা নথি প্রকাশ, প্রকাশে সহযোগিতা কিংবা প্রকাশের কারণ হতে পারবেন না—এমন বিধানও আইনে রাখা হয়েছে।
