পারিবারিক সম্পত্তি আইন নিয়ে আপত্তি তুলে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়। এ ধরনের আইন করার আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও দেশের আলেমদের সঙ্গে পরামর্শেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে নগরীর আল ফারুক সোসাইটিতে আয়োজিত খুলনা জেলা দায়িত্বশীল সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আজহারুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে মদিনার আদলে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছিল। এখন যদি কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন করা হয়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে রক্ষা করা হলো—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ ধরনের আইন প্রণয়ন করা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও জানান জামায়াতের এই নেতা।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হলে সরকারকে জনগণের আন্দোলনের মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় সাময়িকভাবে উপেক্ষা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলেও জনগণ তা মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা কাজ করবে। সরকার সেই রায় বাস্তবায়ন না করলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।
কর্মীদের চরিত্র ও ধর্মীয় অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব
জামায়াতের কর্মীদের উদ্দেশে আজহারুল ইসলাম বলেন, শুধু দলীয় পরিচয় থাকলেই একজন কর্মীর দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ফরজ ও ওয়াজিব পালনের পাশাপাশি হালাল-হারাম মেনে চলা, কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের অধিকার নষ্ট না করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তার মতে, মানুষের হক নষ্ট করলে পরকালে এর কঠিন পরিণতি হতে পারে। তাই কর্মীদের নিজেদের আমল ও চরিত্র সংশোধনের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংগঠন শক্তিশালী করতে চারটি বিষয়ে গুরুত্ব
জামায়াতের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, শুধু সদস্য সংখ্যা বাড়ালেই একটি সংগঠন শক্তিশালী হয় না। কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় না হলে বাইরে থেকে সংগঠন বড় মনে হলেও ভেতরে তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
দায়িত্বশীল নেতাদের উদ্দেশে তিনি সংগঠনকে শক্তিশালী করা, সম্প্রসারণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের মানোন্নয়ন—এই চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে দায়িত্বশীলদের সংগঠনের জনশক্তির প্রতি অভিভাবকসুলভ ও সহানুভূতিশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ভোটে সমর্থন রূপান্তরের সক্ষমতা প্রয়োজন
সামনে নির্বাচন উল্লেখ করে আজহারুল ইসলাম বলেন, শুধু মানুষের সমর্থন অর্জন করলেই নির্বাচনে সফল হওয়া যাবে না; সেই সমর্থনকে ভোটে রূপ দেওয়ার সাংগঠনিক সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ জন্য ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সংগঠনকে বিস্তৃত করার ওপর জোর দেন তিনি।
জামায়াতের প্রতি বর্তমানে সমর্থন নেই কিংবা ধর্মীয় অনুশীলনে দুর্বল—এমন মানুষদেরও দূরে সরিয়ে না রেখে কাছে টানার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি সংগঠনকে বটগাছের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সেখানে ভালো-মন্দ নির্বিশেষে মানুষের আশ্রয়ের সুযোগ থাকা উচিত। তবে কাউকে কাছে টানার অর্থ তার অনৈতিক বা খারাপ কাজকে সমর্থন করা নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আজহারুল ইসলাম বলেন, ডাক্তার রোগীকে ঘৃণা করেন না, বরং রোগকে ঘৃণা করেন। একইভাবে মানুষের ভুল ও দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি যোগ্য ও সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আল্লাহর সন্তুষ্টিই সাংগঠনিক কাজের মূল প্রেরণা
জামায়াতের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান বা মেম্বার হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের প্রত্যাশা থেকেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে হবে। তাঁর মতে, জান্নাতের আকাঙ্ক্ষাই কর্মীদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রেরণা হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, কোনো কর্মীকে সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় থাকার জন্য বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হলে বুঝতে হবে, ওই কাজের গুরুত্ব তার মধ্যে যথেষ্ট গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই কর্মীদের মধ্যে পরকাল ও জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার প্রয়োজন রয়েছে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ইসলামী আন্দোলনে সময় ও অর্থ ব্যয় করার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তিকে সামনে রেখে নিষ্ঠা, ত্যাগ এবং সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
