১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পাকিস্তানের জাতির জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাম্প্রতিক সামাজিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ঐতিহাসিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে জিন্নাহর ভাষণের প্রকৃত বার্তা এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের চেতনা নিয়ে নানা মতবাদ সামনে আসছে।
ঐতিহাসিক দলিল ও জিন্নাহর মূল ভাষণ উদ্ধৃত করে এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, জিন্নাহর কার্জন হলের বক্তব্যকে আংশিক বা ‘কাটপিস’ হিসেবে উপস্থাপন করে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। মূল বক্তব্যে জিন্নাহ উল্লেখ করেছিলেন যে, পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে কোন ভাষা দাপ্তরিক হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণের পূর্ণ এখতিয়ার সেই প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষার ব্যবহারের বিষয়ে জিন্নাহর কোনো আপত্তি ছিল না এবং প্রাদেশিক পর্যায়ে বাংলা চালুর সপক্ষেই তাঁর বক্তব্য ছিল।
তবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে বেছে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল বহুভাষিক পাকিস্তানের সব প্রদেশকে একটি একক সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ রাখা। সে সময় পাকিস্তানের ৫টি প্রদেশের (পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বাংলা) জনগণের ভাষা ভিন্ন হলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উর্দুর সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ফলে আন্তঃপ্রাদেশিক দাপ্তরিক যোগাযোগের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সমন্বয় সাধন, বাংলা ভাষাকে নিপীড়ন করা নয়।
এই বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয় যে, জিন্নাহর মাতৃভাষা ছিল গুজরাটি এবং তৎকালীন সিংহভাগ শাসকের ভাষা ছিল পাঞ্জাবি; ফলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা কোনো একক জাতির আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা ছিল না। বহুসংস্কৃতি ও বহুভাষার দেশে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ইংরেজি বেছে নেওয়া অধিক যুক্তিসঙ্গত হতে পারত বলে স্বীকার করা হলেও, জিন্নাহকে ‘বাঙালি-বিদ্বেষী’ হিসেবে চিত্রায়িত করাকে অতিরঞ্জিত ও ইতিহাস বিকৃতি বলে অভিহিত করা হয়েছে।
অপরদিকে, দেশবিভাগের পটভূমি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, বাঙালিরা ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল। তাই ৫৬ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে এককভাবে বাংলাকে গোটা পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল কাঠামোগত চেতনার বিপরীত ছিল। তৎকালীন অন্যান্য প্রদেশ নিজেদের মাতৃভাষা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা উর্দুকে মেনে নিয়েছিল এবং পরবর্তীতে বাঙালির দাবির মুখে জিন্নাহ নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করেছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ টেনে জিন্নাহ-বিরোধী প্রচারণাকে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণে ভারতের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘু নিপীড়নের উদাহরণ টেনে বলা হয়, স্বাধীন ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা ও জিন্নাহর ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন না করে তাঁকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা মূলত নিজেদের ঐতিহাসিক আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনাকে খর্ব করার শামিল।
