কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও তিনটি হত্যাকাণ্ড ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাকে না পেয়ে ওই দিনই তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশ বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধান চালায়। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, শুক্রবারই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার এক ব্রিফিংয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে বাধা দিলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তারা।
পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলে যায়। অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজ আরও পর্যালোচনা করে পুলিশ। মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগেই অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন স্বীকার করে, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে ওই নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় ফাহাদ ও তার এক বন্ধু জড়িত বলেও তুহিন জানায়। পরে অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকেও হেফাজতে নেওয়া হয়।
খুলনায় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
একই সময়ে শুক্রবার রাতে খুলনা নগরীর একটি ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অভিযোগ তুলে বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন আযমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরোডসংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। আজমুলের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস চুরির অভিযোগে আজমুলকে আটক করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি বিভিন্ন জিনিস নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে ওই শিক্ষার্থী জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে লাউডস্পিকারে আজমুলকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়। ফোনে আজমুল তার বাবাকে জানান, তিনি সেখানে থাকেন এবং টাকা ও অন্যান্য জিনিস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। পরে ফোনটি অন্যদের হাতে দেওয়া হয় এবং তার বাবাকে সেখানে এসে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়।
পরিবারের দাবি, মারধরের পর আজমুলের বাবার কাছে ফোন করে চুরির ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল।
সুনামগঞ্জে তিন সন্তানসহ বাবার কীটনাশক পান
শুক্রবার রাত ১টার দিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রজনীলাইন গ্রামে তিন সন্তানকে নিয়ে কীটনাশক পান করেন সরফত আলী নামে এক ব্যক্তি। এতে তার তিন সন্তানের মৃত্যু হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সরফত আলীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
নিহত তিন শিশু হলো—রজনীলাইন গ্রামের সরফত আলীর মেয়ে মাওয়া আক্তার (১০) এবং ছেলে শামিম মিয়া (৭) ও তামিম মিয়া (২)।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সরফত আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম তিন দিন আগে সৌদি আরবে যান। বিদেশে যাওয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য ছিল বলে জানা গেছে। শুক্রবার রাতে সরফত আলী তিন সন্তানকে নিয়ে ঘুমাতে যান। পরে রাত ১টার দিকে সন্তানদের নিয়ে কীটনাশক পান করেন তিনি।
বিষপানের পর সরফত আলী ময়মনসিংহে থাকা তার এক ফুফুকে ফোন করে বিষয়টি জানান এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে ক্ষমা চান। পরে তার ফুফু বাড়িতে থাকা ছোট ভাই রহমত আলীকে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে রহমত আলীসহ পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাড়িতে গিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে চারজনকে উদ্ধার করেন। পরে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। সরফত আলীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মানিকগঞ্জে একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার
পরদিন শনিবার দুপুরে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের জান্নাকান্দি গ্রামে নিজ ঘর থেকে সৌদি প্রবাসী ইকরাম হোসেন, তার স্ত্রী সানজিদা এবং তাদের দেড় বছর বয়সী শিশুসন্তান আলেজার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইকরাম হোসেন কিছুদিন আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। শনিবার দুপুরে ঘরের ভেতর তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পাশেই ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ইকরামের লাশ পাওয়া যায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে।
তবে কী কারণে একই পরিবারের তিনজনের এমন মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট কিংবা অন্য কোনো কারণ এর পেছনে ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদেশ থেকে ফেরার পর ইকরাম পরিবারের সঙ্গেই ছিলেন। তার সঙ্গে স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের কোনো বিরোধ কিংবা পারিবারিক কলহ চলছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. মনির হোসে







