বাংলাদেশের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে বিদ্যমান চারটি স্কিমের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন এই পদ্ধতি কেন চালু করা হচ্ছে, কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এটি কতটা কার্যকর হবে—এসব বিষয় নিয়ে এখন কাজ চলছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের আরও বেশি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনতেই প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যবস্থার পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে মুনাফার হার বৃদ্ধি, পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বাড়ানোসহ আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী ব্যক্তিদেরও সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে বিনিয়োগের ক্ষেত্র, মুনাফার নিশ্চয়তা এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জনসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
কেন শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি?
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিবন্ধন করেছেন। এসব গ্রাহকের জমা করা প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
চারটি স্কিমের মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধন করেছেন। অন্যদিকে ‘সুরক্ষা’, ‘প্রবাস’ ও ‘প্রগতি’ স্কিমে নিবন্ধনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
এ অবস্থায় সর্বজনীন পেনশনে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদ্যমান চারটি স্কিমের অধীনেই শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। নতুন পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি তৈরির জন্য আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান বলেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম হবে না। এটি বিদ্যমান চারটি স্কিমের ইসলামিক সংস্করণ হিসেবে চালু করা হবে।
তিনি জানান, ‘প্রবাস’ স্কিমের পাশাপাশি ‘প্রবাস শরিয়া’, ‘প্রগতি’র পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক প্রগতি এবং একইভাবে ‘সুরক্ষা’ ও ‘সমতা’ স্কিমেও শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প থাকবে। ফলে গ্রাহক প্রচলিত মুনাফা ব্যবস্থায় অথবা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
অর্থাৎ সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী গ্রাহক শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন।
কীভাবে পরিচালিত হবে?
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও কারিগরি দিক নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি এর আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়-দায়িত্বও বিশ্লেষণ করা হবে।
শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির জন্য পৃথক শরিয়া বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সুকুক বন্ডসহ কোন কোন খাতে অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
শেখ কামরুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ড এবং বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শরিয়া কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া হবে।
কার্যকারিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন
শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলে সর্বজনীন পেনশনে নতুন একটি গ্রাহকগোষ্ঠী যুক্ত হতে পারে। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমানে প্রচলিত পেনশন তহবিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে সুদ আয় করে। কিন্তু শরিয়াহভিত্তিক তহবিল সুদ গ্রহণ করতে পারবে না। ফলে এই তহবিল কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্যবস্থাটির নামের সঙ্গে ‘শরিয়াহ’ যুক্ত করলেই হবে না। গ্রাহকদের নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের অর্থ সত্যিকার অর্থেই সুদমুক্ত ও শরিয়াহসম্মত খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক মো. আহসান হাবীব মনে করেন, সর্বজনীন পেনশনে পণ্যের বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। কারণ দেশের একটি অংশ সুদভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী হতে পারে।
তার মতে, বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক পণ্যের বৈচিত্র্য তৈরি করা জরুরি।
বিনিয়োগের সুযোগ কতটা?
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা কার্যকর করতে সুকুক বন্ড, ইসলামিক ইক্যুইটি এবং হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকা ভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
সুকুক বন্ডে প্রচলিত অর্থে সুদের হার নির্ধারণ করা হয় না। অন্যদিকে ইসলামিক ইক্যুইটির ক্ষেত্রে শরিয়াহসম্মত ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়।
তবে বাংলাদেশে সুকুকের বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট। ফলে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা না গেলে এই ব্যবস্থায় মুনাফার হার প্রচলিত স্কিমের তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে গ্রাহকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকের আস্থা অর্জনের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন শরিয়া বোর্ড, নিয়মিত শরিয়াহ অডিট এবং স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের সংকটের প্রসঙ্গে অধ্যাপক আহসান হাবীব বলেন, এসব সমস্যার জন্য ব্যাংকিং মডেলকে দায়ী না করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ অন্যান্য কারণ বিবেচনা করা উচিত।
পেনশন ব্যবস্থায় আরও যেসব পরিবর্তন
শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী সর্বোচ্চ ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পেতেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই বয়সসীমা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। পেনশনার নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত আজীবন পেনশন পাবেন।
পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফার হারও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির যেসব কর্মী প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধার আওতায় নেই, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে ‘প্রবাস’ স্কিমের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশ যাওয়ার আগে তাদের এ বিষয়ে অবহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিমানবন্দরেই নিবন্ধনের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পেনশনে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আগে ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হতো। এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করা যায় কি না—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি বিনিয়োগের বৈচিত্র্য, সুবিধা সম্প্রসারণ ও নিবন্ধনে প্রণোদনার মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন ব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ, স্বচ্ছতা, মুনাফার কাঠামো এবং গ্রাহকের আস্থা তৈরির ওপর।







