সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে বর্তমানে সরগরম হয়ে উঠেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী ও সচিবের দপ্তরে গত কয়েক দিন ধরে সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও তাদের অনুসারীদের ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ লক্ষ্য করা গেছে। সবারই একটাই লক্ষ্য—নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে ডিলিংশিপ পাইয়ে দেওয়া।
উপচে পড়া ভিড় ও তদবিরের চিত্র
চলতি বছরের গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল নতুন সার ডিলার নিয়োগের আবেদনের শেষ দিন। এরপর থেকেই মূলত সচিবালয়ে জোর তদবির শুরু হয়। বিশেষ করে গত রোববার ও সোমবার কৃষিমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে শত শত মানুষের ভিড় জমে, যার অধিকাংশই ডিলারশিপ পাওয়ার আশায় মন্ত্রীর সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী ঢাকার বাইরে থাকায় তদবিরকারীদের বড় অংশটি সচিবের দপ্তরের সামনে ভিড় করেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সূত্র জানায়, সারা দেশে ৪,৯৩১টি নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে মোট ৪৬,৯৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ, প্রতিটি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১০ জন প্রার্থী আবেদন করেছেন।
সচিবালয়ের করিডোরে বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। নাটোরের লালপুরের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি, বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান, রংপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা এবং ভোলা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কবীর মৃধাসহ অনেকেই নিজ ও স্বজনদের ডিলারশিপের তদবির নিয়ে সচিবের দপ্তরে আসেন। মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ
রাজনৈতিক তদবিরের পাশাপাশি ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির গুঞ্জন রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু অডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ডিলারশিপের জন্য বড় অংকের ঘুষ লেনদেনের কথোপকথন শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিয়োগ প্রক্রিয়া ও নীতিমালা
কৃষি মন্ত্রণালয় গত ২৭ আগস্ট নতুন সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ করে। নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নির্বাচনের ধাপগুলো হলো:
-
প্রাথমিক যাচাই: আবেদনপত্রগুলো প্রথমে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে উপজেলা কমিটির কাছে পাঠাবে।
-
উপজেলা ও জেলা কমিটি: উপজেলা কমিটি তথ্য যাচাই করে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। পরবর্তীতে জেলা কমিটি তা পুনরায় যাচাই করে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠাবে।
-
চূড়ান্ত মনোনয়ন: কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদনপত্র পরীক্ষা করে ইউনিয়নপ্রতি একজনকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে।
উল্লেখ্য, উপজেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাঠপর্যায়ে এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব সেলিম খান জানান, আবেদনগুলো উপজেলা ও জেলার মাধ্যমে আসার পর সরকারি বিজ্ঞপ্তির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিভাগ ও জেলা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে। লাইসেন্স দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসেনি। তবে নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে সবচেয়ে যোগ্য আবেদনকারীকেই নির্বাচিত করা হবে।
