অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে মার্কিন হস্তক্ষেপ সরাসরি এসে এদেশে পড়েছিল। সে সময় বন্ধু নামক সাম্রাজ্যবাদী ভারত রাষ্ট্র একপ্রকার বঞ্চিত হয়ে পড়লেন। এই ক্ষোভে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও সেসময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেকটাই সামলে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, মবসন্ত্রাস, শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন সমস্যা ক্রমশ বেড়েই চলছিল। তখন চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং প্রমাণে বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হচ্ছিলেন এবং তাদের গ্রেফতারের পরপরই কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে তাদের দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসছিল। কিন্তু এখন পত্রিকা, টিভি, অনলাইন নিউজপোর্টালে মনোযোগ দিলে চাঁদাবাজি নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে শুধুমাত্র বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর চাঁদাবাজির অভিযোগ আসছে, সেই সঙ্গে সত্যতাও মিলছে। বহিষ্কার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যেভাবে চাঁদাবাজির খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেভাবে আর বহিষ্কারের খবরটা আসছে না।
নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বলতে শোনা গেল, নির্বাচন হচ্ছে না বলেই দেশে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্বাচন হয়ে গেলে সব ধরনের অপরাধমূলক কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর আমরা ১৩তম জাতীয় নির্বাচন দেখলাম। ৩০০ আসনে লড়াই করে বিএনপি ২০৯ আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়লাভ করলেন। কিন্তু সেই সমস্ত নেতাকর্মীদের প্রতিশ্রুতি এখন যেন ধোঁয়ার মতো মিশে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের মাত্র সাড়ে সাত মাসের মধ্যে চাপা জনঅসন্তোষ দেশজুড়ে প্রকাশ পাচ্ছে। কারণ দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস, তেল, সারসহ বিভিন্ন ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে এবং প্রকল্প দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, খুন, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। আর এই জন্যই সরকার ক্ষমতার সময়সীমা সম্পর্কে রাষ্ট্রের ভাবুক শ্রেণির মানুষদের মধ্যে একপ্রকার সমালোচনামূলক আলোচনা চলছে।
নির্বাচনের সাড়ে সাত মাস না যেতেই কেন সমালোচনার মুখে বিএনপি সরকার?
এমন শিরোনামে বিএনপিপন্থীরা বিস্মিত হবেন এবং মনে মনে অথবা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন। আজকাল দেখা যাচ্ছে, সরকারের সমালোচনা করায় বাড়িঘরে হামলা করা হচ্ছে। আর সেই হামলাগুলোকে স্বীকৃতি দিতে তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে আওয়ামী লীগপন্থী খেতাব। এটা প্রচলিত আছে যে, বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ধারার লেখকরা প্রতিটি সরকারের রাষ্ট্র শাসনের সময় বিরোধী দলের দালাল হিসেবে সমালোচিত হয়েছেন। বাংলাদেশে বসবাসরত রাষ্ট্রভাবনার লেখকদের লেখালেখি করা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তাই আগে যাদের প্রতিবাদমূলক লেখা পাওয়া যেত, এই মুহূর্তে তাদের অনেককেই চুপ করে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক লেখকের কাজ কী, রাষ্ট্রের যেকোনো পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ নিয়ে তার গুণগান গাওয়া, নাকি রাষ্ট্রের ভেতরের গলদ খুঁজে বের করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা করা?
যে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিএনপি সরকার আজ ক্ষমতার চূড়ায় বসতে পেরেছেন, আজ সেই নির্বাচনের সাড়ে সাত মাসের মধ্যে দেশের এই বিশৃঙ্খলার দাপটের দিকে তাকিয়ে জনগণ অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়ছেন। কারণ বর্তমানে দখল, চাঁদাবাজি, খুন, ছিনতাই, দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেই সঙ্গে এগুলো প্রকাশের জেরে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার পরিসংখ্যান দেখলে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, বিএনপি সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিকে হাঁটতে পারছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশাআকাঙ্ক্ষা কী ছিল? দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে তাকিয়ে বলতে হয়, সম্ভবত বর্তমান সরকার এখনও সেটা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি এবং প্রধান বিরোধীদলগুলোও সেই বিষয়ে খুব একটা উপলব্ধি করতে পারছেন না। মূলত যেকোনো গণঅভ্যুত্থান ঘটে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত জনসাধারণের নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকে। সুতরাং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যদি সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হয়, তাহলে আবারও গণঅভ্যুত্থানের পথ তৈরি হয়ে যায়। এটা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার এক প্রচলিত নিয়ম। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর সরকার বা শাসক সেটা রোধ করতে পারেন না।
গণমাধ্যমের সংবাদের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে, যত্রতত্র লাগামহীনভাবে চাঁদাবাজি বেড়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি চাঁদা না পাওয়ায় মানুষও খুন করা হচ্ছে। যেহেতু রাষ্ট্রের নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের, তাহলে কি স্বাভাবিকভাবে জনমনে প্রশ্ন আসতে পারে না, বর্তমান সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়ে পড়ছেন?
সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এই সমস্ত চাঁদাবাজির পেছনে সরাসরি জড়িয়ে আছেন বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যেটুকু চাঁদাবাজি বেড়েছিল, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি এখন একদলীয়ভাবে বৃহৎ আকারে গিয়ে পৌঁছেছে। এখন গণমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশের একটি অংশই দখল করে আছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির খবরে। আর প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি এতে সেই দলের নেতাকর্মীরাও আজ নিরাপদে নেই। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় নিজের দলের লোকের হাতে খুন হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলেও সেই সমস্ত নেতাকর্মীদের দল থেকে খুব একটা বহিষ্কার বাড়ছে না। আর যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, তারা কয়েকদিনের মধ্যে জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। স্টার নিউজের একটি প্রতিবেদনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদস্য জুয়েল জানান, অপরাধীদের গ্রেফতারের আগেই সিস্টেমে জামিনের ব্যবস্থা করে রাখে। আবার চাঁদাবাজির প্রমাণে গ্রেফতার করার দুই দিন পর জেল থেকে বেরিয়ে তারাই পুলিশকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা যায়, এটা শুধু প্রশাসনিক শক্তির দুর্বলতার চিত্রই প্রকাশ পায় না, বরং আইনি দুর্বলতায় নিঃসন্দেহে অপরাধপ্রবণতা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া মাছে-ভাতে বাঙালি আজ সারের অভাবে জমিতে ফলাতে পারছেন না ফসল। সার সংকটে দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদে কৃষকরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। ফসল রক্ষার স্বার্থে কোথাও কোথাও বাধ্য হয়ে গুদাম থেকে সার লুট করতে হয়েছে। এখন গ্রেফতার ঠেকাতে তাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। একজন কৃষক জমিতে ফসল ফলাবেন, নাকি গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াবেন? তাহলে সেই জমিগুলোতে ফসল উৎপাদন করবেন কারা?
প্রতিবছর কৃষকরা এমনিতেই ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। তার ওপর কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করায় তাদের বেশি দামে সার কিনতে গেলে ফসলে চরম পর্যায়ের লোকসান গুনবেন। অথচ কিছুদিন আগে জানা গেল, মিয়ানমারে ৭০০ বস্তা সার পাচারের সময় দুইজনকে আটক করা হয়েছে। তাছাড়া সারের অভাবে ভালো ফসল উৎপাদন না হলে দেশের মানুষ খাবে কী? তখন চালের বাজার কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে, এই বিষয়ে সরকারকে আগে থেকে ভাবতে হবে। তা না হলে স্বাভাবিকভাবে জনঅসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পাবে।
কোটি টাকার নির্মাণকাজে মিলছে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক করুণ চিত্র। সেতু নির্মাণে রডের বদলে দেওয়া হচ্ছে আস্ত বাঁশ। শুধু অভিযোগ নয়, মিলছে জলজ্যান্ত প্রমাণ। তাছাড়া নতুন পিচঢালা রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই বাজে। কয়েকদিন না যেতেই উঠে যেতে শুরু করেছে পিচঢালা পাথর। কোথাও তৈরি হয়েছে ছোট ছোট গর্ত। রাস্তা মেরামতের নামে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতির মহড়া। বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর আসছে। জনগণের টাকায় উন্নয়ন প্রকল্প যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয়ে সেটা নামমাত্র রাস্তা হয়ে বাজেটের বৃহৎ অংশ যদি একটি শ্রেণির পকেটে চলে যায়, তাহলে এমন অবস্থা স্বাভাবিকভাবে সরকারব্যবস্থা নিয়ে কড়া সমালোচনা তো বাড়বেই।
বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মিডের তথ্য মতে, গত তিন মাসে ১৬২ জন গণমাধ্যমকর্মী নির্যাতন ও লাঞ্ছিতের শিকার হয়েছেন। কিছুদিন আগে সরকারদলীয় এক নেতা তিন সাংবাদিককে মারধরের পর বলেন, ‘তোমরা লিখবা, আমরা পিডামু।’ সরকারদলীয় নেতার এমন ভাষায় দেশের সাংবাদিকরা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। গতকাল ঢাকা পেপার্সের প্রডিউসারকে মেসেঞ্জারে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনের কাগজে প্রকাশিত সংবাদে পাওয়া তথ্যেতে বলা হয়েছে, একজন সংবাদকর্মীকে তানভীর নামে ছাত্রদল নেতা হুমকি দিয়ে বলেছেন, খবর প্রকাশ করতে চাইলে তার মাথায় গুলি করা হবে। মতপ্রকাশের মাধ্যমগুলোর কর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে কীভাবে সাধারণ জনগণের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব, বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের কাছে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার একটি ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম। তবে নেতাকর্মীদের ভয়ভীতিতে যদি দুটোই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এই নীরবতা কতদূর পৌঁছে যেতে পারে, সেই ধারণা সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বুঝতে একটু অসুবিধাই হচ্ছে।
তাছাড়া সরকার ও প্রশাসন যদি চাঁদাবাজি বন্ধ করতে অক্ষম হন, তাহলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে গণআন্দোলন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারণ মাত্র দুই বছর আগে হাজার খানেক লাশের ওপর দিয়ে একটি গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। সুতরাং জনগণের আর ১৭ বছর ধরে রাষ্ট্রের গলদ ও অনিয়ম সহ্য করার মানসিক ক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। তাদের প্রতিবাদের ভাষা এখন আরও ধারালো। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। তা না হলে সাধারণ মানুষের সরকারের প্রতি ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে। এতে সরকার ও তার প্রশাসনের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
