২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) দেওয়া কার্যাদেশ দেখিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৮৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবু নাসের সরকার (দুলাল)-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, এনসিটিবির কাছ থেকে পাওয়া বিলের অর্থ ঋণদাতা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। গত ১০ মাস ধরে ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করা হচ্ছে না বলে দাবি ব্যাংকটির।
এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে এনসিটিবিকে লিখিত চিঠি দিয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখা। চিঠির একটি অনুলিপি দৈনিক ইত্তেফাকের হাতে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, কার্যাদেশের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সময় বই সরবরাহের বিলের অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বিলের অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নতুন করে ১১০ কোটি টাকা ঋণের চেষ্টা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ পেয়েছিল সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্যও প্রায় ১৩০ কোটি টাকার বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে।
এদিকে, আগের ঋণ পরিশোধ না করেই প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী এনসিসি ব্যাংকের পান্থপথ শাখা থেকে কার্যাদেশ দেখিয়ে আরও ১১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি জানতে পেরে প্রিমিয়ার ব্যাংক এনসিটিবিকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে।
পাঠ্যবই মুদ্রণে ব্যয় বৃদ্ধি ও নিম্নমানের বইয়ের অভিযোগ
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য এনসিটিবি ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এবার বই মুদ্রণের ব্যয় গতবারের তুলনায় ৩০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি মূল্যে কাজ পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কিছু প্রতিষ্ঠান রাতের আঁধারে নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপাচ্ছে। সম্প্রতি এনসিটিবির একটি পরিদর্শক দল সরেজমিনে গিয়ে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের ছাপানো নিম্নমানের এক লাখ কপি বই জব্দ করে। ভবিষ্যতে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার না করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আবু নাসের সরকারকে সতর্কও করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংকের অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) বরাবর পাঠানো চিঠিতে প্রিমিয়ার ব্যাংক জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের আর্থিক লেনদেন রয়েছে। প্রতিবছর এনসিটিবির অধীনে বই সরবরাহের কাজ করা বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকটি ঋণসুবিধা দিয়ে আসছিল।
ব্যাংকটির মতিঝিল শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, বই সরবরাহের বিলের অর্থ সরাসরি প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় দুলালের হিসাবে জমা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, অন্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করায় শাখাটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে দুলালকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ব্যাংকের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনায় পাঠ্যবই মুদ্রণ খাতে ঋণ দিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এর ফলে নিয়মিত ও সুনামধারী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাতুয়াইলের এক ছাপাখানার মালিক ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিবছর তিনি পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ঋণ নিতেন। এবারও ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ঋণ না পাওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কেন সমস্যায় পড়বে?
অভিযুক্ত ও এনসিটিবির বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবু নাসের সরকার (দুলাল) ইত্তেফাককে বলেন, ছাপাখানায় কিছু ত্রুটিপূর্ণ বই ছিল, যেগুলো এনসিটিবির পরিদর্শক দল জব্দ করেছে। তবে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এনসিটিবির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছ থেকে অভিযোগসংবলিত চিঠি পাওয়া গেছে। বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।







