ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একচ্ছত্র ক্ষমতা ও রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তাঁর ‘অজেয় ও অপরাজিত’ নেতৃত্বের ভাবমূর্তি। তবে রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে প্রগতিশীল তরুণ, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভ সেই প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হেনেছে। অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন দমনে মোদি সরকারের চরম আক্রমণাত্মক ও বলপ্রয়োগের নীতি রাজপথের ক্ষোভ কমানোর বদলে বরং তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতাকেই বিশ্ব দরবারে উদোম করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং লন্ডনের বিখ্যাত সোয়াস (SOAS) বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবীর সিনহার পর্যবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে বেশ অর্থবহ। তাঁর মতে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই নজিরবিহীন প্রতিবাদের রাজনৈতিক তাৎপর্য কেবল বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তার বা রাজপথে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মোদি সরকারের তীব্র দমনপীড়ন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্ধ ব্যবহার প্রমাণ করছে যে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া, লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম কর্তন এবং সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম মোদি সরকারের ‘ভয়ের রাজনীতি’কে সরাসরি ছুড়ে ফেলেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ থেকে শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগঠনের নেতারা এখন প্রকাশ্যে ‘সরকার পরিবর্তনের’ ডাক দিচ্ছেন। তাদের এই প্রকাশ্য হুংকার ভারতীয় রাজনীতির সেই পুরনো সমীকরণকে ভেঙে দিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গণকণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হতো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদি এতদিন নিজেকে যেভাবে ভারতের একমাত্র ‘শক্তিশালী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী’ নেতা হিসেবে তুলে ধরতেন, রাজপথের ক্ষুব্ধ তরুণরা সেই মিথ চুরমার করে দিয়েছে। প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশি হামলা, টিয়ারগ্যাস ও বিরোধী আইনপ্রণেতাদের আটকের যে দৃশ্যগুলো মিডিয়ায় উঠে আসছে, তা বিশ্বমঞ্চে নরেন্দ্র মোদির স্বৈরাচারী রূপকে প্রকাশ করে দিচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান তরুণ আন্দোলন আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নির্বাচনের ওপর যে গভীর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলেও এখন চরম উদ্বেগ দৃশ্যমান।
