যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা আগের যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরান। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের সমাপ্তি কখন এবং কী শর্তে হবে, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এককভাবে নির্ধারণ করতে পারবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
রোববার (১ নভেম্বর) ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামনিয়া এ সতর্কবার্তা দেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে নতুন করে হামলার হুমকি আসছে। ফলে অঞ্চলটিতে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আকরামনিয়া বলেন, ভবিষ্যতে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের তুলনায় আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধ কখন শেষ হবে কিংবা কোন শর্তে এর অবসান ঘটবে, তা নির্ধারণের একক ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকবে না।
ইরানে নতুন হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের
ইরানের এই হুঁশিয়ারির আগে দেশটির কয়েকটি অবশিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত হামলা চালানোর ইঙ্গিত দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফ্লোরিডায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইরানে আরও একটি বা দুটি স্থাপনা ধ্বংস করা বাকি রয়েছে। চাইলে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই সেগুলোতে হামলা চালানো সম্ভব।
এ সময় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার কথাও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূচনা হয়। যুদ্ধের তীব্র পর্যায়ে ইরান পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এ সময় লেবানন ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধের বিস্তৃতি নিয়ে আইআরজিসির হুঁশিয়ারি
ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা।
রোববার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না। প্রতিপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতে বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। এর আগের দিন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও এক লিখিত বার্তায় একই ধরনের সতর্কতা জানিয়েছিলেন।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের চিঠি, ইরানের কঠোর শর্ত
এদিকে শনিবার ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি জানান, আলোচনা পুনরায় শুরুর উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি তিনি পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করলেও চিঠির জবাব এখনো দেননি তিনি। রেজায়ি বলেন, ইরান আগেই ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না এবং কোনো আলোচনাও অনুষ্ঠিত হবে না।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশে জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা, দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সব যুদ্ধফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করা।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করে আসছে ইরান। দেশটির অনুমতি ছাড়া প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজেও একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোতে পাল্টা নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন উপসাগরীয় দেশগুলো
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ।
রোববার বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এক সম্মেলনে তিনি বলেন, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হবে বলে তারা আশা করছেন। তবে একই সঙ্গে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও রাখছে আমিরাত।
গারগাশ বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অগ্রগতি আসবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন। আঞ্চলিক স্বার্থ বিবেচনায় নতুন করে আরেক দফা সংঘাত কারও কাম্য নয়। তবে অতীতের মতো এবারও সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।
তেহরানের বাসিন্দাদের মধ্যে যুদ্ধের উদ্বেগ
নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় ইরানের রাজধানী তেহরানের বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ ও ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
২৭ বছর বয়সী স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোহাদেসে এএফপিকে বলেন, সাম্প্রতিক খবরগুলো সত্যিই উদ্বেগজনক। তবে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এসব নিয়ে যতই চিন্তা করা হোক না কেন, বাস্তবে তার কিছু করার নেই।
অন্যদিকে ৪৮ বছর বয়সী বিক্রেতা ইব্রাহিমের মধ্যে তেমন উদ্বেগ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, তারা আরেকটি যুদ্ধকে ভয় পান না। ৪৮ বছর ধরেই তারা যুদ্ধের মধ্যে রয়েছেন এবং সব সময়ই যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
কূটনৈতিক আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই দেশের বিরোধ সংকট নিরসনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
সূত্র: এএফপি
