ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর ও অভূতপূর্ব উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে মহাদেশটির খাদ্য সরবরাহ, রক্ত ব্যাংক ও বিমান চলাচলের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অবকাঠামোতে একের পর এক সাইবার হামলা, নাশকতা ও বোমা হামলার ভীতি ছড়ানো হচ্ছে; অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তার নাগরিকদের সরকারি সাহায্য ছাড়া অন্তত ৭২ ঘণ্টার জরুরি বেঁচে থাকার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউজার স্ট্র্যাটেজি’র আওতায় সদস্যদেশগুলোকে নাগরিকদের এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে, যেন সাইবার হামলা, ব্ল্যাকআউট, খাদ্য ও বিদ্যুৎ সংকট কিংবা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে প্রাথমিক তিন দিন মানুষ নিজে থেকে টিকে থাকতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, ইউরোপ কি কেবল সম্ভাব্য মহাযুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে, নাকি নেপথ্যে এমন কোনো অদৃশ্য ও বড় নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে—যার পুরো সত্য এখনো আড়াল রাখা হচ্ছে?
খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে এক রহস্যময় সাইবার হামলা। ফ্রান্সে শুরু হওয়া এই হামলায় দুর্বৃত্তরা দূর থেকে বেলজিয়াম, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার ক্যারেফোর ও ডেলহাইজের মতো জায়ান্ট সুপারশপগুলোর ফ্রিজার ব্যবস্থার তাপমাত্রা বাড়িয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তুলে দেয়। এর ফলে কোটি কোটি টাকার পচনশীল খাদ্য সামগ্রী নষ্ট হয়ে তীব্র খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়।
খাদ্য খাতের পর সাইবার হামলার বিষাক্ত থাবা পড়েছে ইউরোপের সংবেদনশীল স্বাস্থ্য খাতেও। ৪ নভেম্বর ফ্রান্সে ‘ফ্রেঞ্চ ব্লাড এস্টাবলিশমেন্ট’ (ইএফএস)-এর তিনটি প্রধান স্থাপনায় সংরক্ষিত রক্ত ও প্লাজমার তাপমাত্রা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তা নষ্ট করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়। সময়মতো সতর্ক সংকেত পাওয়ায় কর্মীরা রক্ত নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হলেও এটি প্রমাণ করে যে, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য কেবল তথ্য চুরি নয়, বরং বাস্তব জগতের জরুরি জীবনরক্ষাকারী পরিষেবা অচল করে দেওয়া।
একই সময়ে ইউরোপের আকাশপথে সৃষ্টি করা হয়েছে ভয়াবহ আতঙ্ক ও অচলাবস্থা। গত ৫ নভেম্বর মাত্র এক দিনে ইউরোপজুড়ে রায়ানএয়ার, উইজ এয়ার ও ফিনঅ্যায়ারসহ ১৫টিরও বেশি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমানে একযোগে বোমা হামলার ভীতি ছড়ানো হয়। সামরিক যুদ্ধবিমান দিয়ে পাহাড়াদিয়ে এসব বিমান জরুরি অবতরণে বাধ্য করা হয়। যদিও তল্লাশিতে কোনো বিস্ফোরক মেলেনি, কিন্তু এমন সমন্বিত ভুয়ো হুমকিতে ইউরোপের বিমান পরিষেবা বিপর্যস্ত ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন গভীরভাবে তদন্ত করছে—এসব হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি প্রতিপক্ষকে সামরিক সংঘাতের আগেই অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা অসমমুখী যুদ্ধের কোনো গোপন নীল নকশা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে এমনিতেই যে সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি চলছে, তার মধ্যে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে এই বহুমুখী আঘাত মহাদেশটিকে চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
