“যুক্তরাষ্ট্রে নাকি শরিয়াহ আইন চালু হতে যাচ্ছে, বেসবল খেলায় হালাল হট ডগ বাধ্যতামূলক হচ্ছে আর শুক্রবারে চলবে শুধুই হুমুস উৎসব!“—ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলের রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কট্টর ডানপন্থীদের দীর্ঘদিন ধরে ছড়ানো এমন অবিশ্বাস্য ও কাল্পনিক ‘ইসলামফোবিক’ প্রোপাগান্ডাকে পুরোপুরি ধুলিসাৎ করে দিয়েছে আমেরিকার ভোটাররা। ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রগতিশীল নেতা প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আল-সাইয়েদ মিশিগানে সিনেটর ডেবি স্ট্যাবেনোর শূন্য আসনে এক ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস গড়ে প্রথম মুসলিম হিসেবে ক্যাপিটল হিলে সিনেটর পদে নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন তিনি।
তবে এই বিজয়ের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না; ক্যাপিটল হিল পর্যন্ত পৌঁছাতে আল-সাইয়েদকে বছরের পর বছর ধরে মোকাবিলা করতে হয়েছে বর্ণবাদ ও চরম ইসলামবিদ্বেষের নোংরা রূপ। ২০১৮ সালে তিনি যখন মিশিগানের গভর্নর পদের জন্য লড়াই করছিলেন, তখন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্যাট্রিক কোলবেক কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বারবার কাল্পনিক অভিযোগ তুলেছিলেন যে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে নাকি আল-সাইয়েদের গোপন যোগসূত্র রয়েছে। ছাত্রজীবনে মিশিগান ইউনিভার্সিটির ‘মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্য হওয়াকেই সেই তথাকথিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ‘প্রমাণ’ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
আট বছর পেরিয়ে এই সিনেট নির্বাচনে এসেও আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অপপ্রচারের ধরন বিন্দুমাত্র বদলায়নি। এবারও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে তিনি নাকি মিশিগানের মূল ধারার মূল্যবোধের জন্য হুমকি এবং আমেরিকা ধ্বংসের ‘গোপন এজেন্ডা’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তবে বিরোধীদের এই মেকি ‘শরিয়াহ আতঙ্ক’ বা ঘৃণার রাজনীতি এবার আর মার্কিন ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারেনি; সচেতন জনগণ কুসংস্কার ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সততাকেই বেছে নিয়েছে।
প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণ সত্ত্বেও আল-সাইয়েদ কখনো পিছু হটেননি কিংবা নিজের মুসলিম পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করেননি। বিজয়ের পর এক তেজস্বী ও সাহসী ভাষণে তিনি সরাসরি চরমপন্থীদের জবাব দিয়ে বলেন, “যারা এতদিন ভেবেছিলেন ‘আব্দুল’ নামের কোনো মানুষ সবার প্রতিনিধি হতে পারবে কি না, আমি আজ তাদের জানাতে চাই—আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে আমরা সবাই সমান। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের জন্য লড়া—তিনি যে ঈশ্বরের কাছেই প্রার্থনা করুন, কিংবা একেবারেই না করুন।”
পররাষ্ট্রনীতি ও মার্কিন বাজেটের অপ্রয়োজনীয় সামরিক ব্যয় নিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নীতিকেও তোপ দেগেছেন এই নবনির্বাচিত সিনেটর। নিজ বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী যুদ্ধনীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বহু দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের নেতারা বিদেশে যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে নির্বিচারে গণহত্যায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ঢেলেছেন, অথচ মিশিগানের সাধারণ পরিবারগুলো ইনসুলিন কেনা বা সন্তানের ডে কেয়ারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিদেশে রক্তের হোলিখেলা ও গণহত্যার জন্য ওয়াশিংটনের ব্লাঙ্ক চেক লিখে দেওয়ার জমানা এবার চূড়ান্তভাবে শেষ।”
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে তথাকথিত ‘ইসলামফোবিয়া’ বা শরিয়াহ আতঙ্ক ছড়ানোর পুরোনো রাজনৈতিক ফর্মুলা এখন পুরোপুরি কার্যকারিতা হারিয়েছে। আল-সাইয়েদের এই ঐতিহাসিক জয় প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বিদ্বেষের রাজনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মার্কিন জনগণ এখন সামাজিক ন্যায়বিচার, গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা ও সৎ নেতৃত্বকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
