ঢাকা থেকে সীমান্তমুখী পরিবহন থেকে লুট করা ১৫০ ভরি স্বর্ণের ভাগাভাগি এবং চরম প্রতারণার জেরেই মাগুরা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মাগুরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদ এবং পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মারুফ হোসেন।
পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বুধবার (৪ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে মাগুরা পুলিশ লাইনের ড্রিল শেডে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অপরাধ উন্মোচন করেন। নিহত সাকের মাগুরা বাস টার্মিনালে ‘রয়েল পরিবহনের’ কাউন্টার মাস্টার এবং পারনান্দুয়ালি গ্রামের মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে ছিলেন।
পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ অক্টোবর। মজিবর রহমান নামে এক ব্যক্তি ঢাকা থেকে গোল্ডেন পরিবহনের বাসে করে ১৫০ ভরি স্বর্ণের (১৪টি বার) একটি চালান নিয়ে ঝিনাইদহ যাচ্ছিলেন। পথে মাগুরার রামনগর এলাকায় পৌর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফের নেতৃত্বে ১২-১৫ জনের একটি সন্ত্রাসী দল বাসটি থামিয়ে মজিবরকে মারধর ও হাত-পা বেঁধে স্বর্ণের চালানটি লুট করে নেয়।
তবে স্বর্ণের চালানে ১৪টি বার থাকলেও ধূর্ত মারুফ অন্য সহযোগীদের না জানিয়ে চতুরতার সাথে ৮টি বার নিজেই লুকিয়ে ফেলেন। বাকি ৬টি বারের মধ্যে ৩টি তথ্যদাতাদের দেওয়া হয়েছে বলে মিথ্যা অজুহাত তৈরি করে বাকিদের প্রতারিত করেন। লুট করা স্বর্ণের এই শুভঙ্করের ফাঁকি ও ন্যায্য হিস্যা নিয়ে সরাসরি বিরোধে জড়ান কাউন্টার মাস্টার ও যুবদল নেতা সাকের হোসেন।
লুট করা স্বর্ণের বিরোধ মেটাতে পরদিন সন্ধ্যায় মাগুরার অব্যবহৃত ট্রাক টার্মিনালে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক বসে। সেখানে সাকের তাঁর ন্যায্য হিস্যা দাবি করলে মারুফের সাথে তাঁর তীব্র হাতাহাতি হয়। পরবর্তীতে মারুফ মাত্র ৫ লাখ টাকা দিয়ে সাকেরের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও সাকের তা প্রত্যাখ্যান করেন। সাকের তাঁর গোপনীয়তা ফাঁস করে দিতে পারেন—এই আশঙ্কায় মারুফ ও গোলাম জাহিদ মিলে সাকেরকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত নীলকশিল আঁকেন।
সাকেরকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফ নগদ ২০ লাখ টাকা তুলে দেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদের হাতে। জাহিদ সেই টাকায় দুজন ভাড়াটে শুটার নিয়োগ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২১ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মাগুরা বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারের ভেতর সাকেরকে লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সটকে পড়ে ভাড়াটে খুনিরা।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নেমে পুলিশ মঙ্গলবার ভোররাতে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করার পর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন জাহিদ। এর আগে ২১ অক্টোবর সাকেরের স্ত্রী শারমিন নাহার মাগুরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন এবং ২৮ অক্টোবর স্বর্ণ লুটের শিকার মজিবুর রহমান ১৪টি স্বর্ণের বার ও নগদ টাকা লুটের আলাদা মামলা করেন।
পুলিশ এ পর্যন্ত জোড়া অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী গোলাম জাহিদ ও মারুফসহ সোনা লুটে জড়িত জুয়েল, তৌকির, ফরিদ মণ্ডল, মিল্টন ও তাঁর স্ত্রী মারুফাকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সহায়তার অভিযোগে রনি শিকদার, শামীমা তাবাস্সুম লুবনা, অনিমেষ মজুমদার এবং বশির আলিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ৬টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেছে এবং ভাড়াটে দুই শুটারকে দ্রুত গ্রেপ্তারের অভিযান জোরদার করেছে।







