রংপুর মেডিকেল কলেজের পিন্নু হোস্টেলে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ইসলামী ছাত্রশিবির শাখা কর্তৃক আয়োজিত একটি ভূরিভোজের আয়োজন বন্ধের দাবিতে কলেজ প্রশাসন ও হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত চিঠি দিয়েছে ছাত্রদল। ঈদের দিন রাতে ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘ঈদের দস্তরখান’ নামে এই বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রংপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (২৭ মে) সকালে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেওয়া চিঠিতে দাবি করা হয়, ঈদের ছুটির এই সময়ে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক আয়োজন ঘিরে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ‘কোরবানির মাংসভিত্তিক দাওয়াত’ ঘিরে অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের মাঝে ধর্মীয় অনুভূতিতে এক ধরনের অস্বস্তিকর বা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার কথাও চিঠিতে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছাত্রদলের চিঠিতে আরও বলা হয়, রংপুর মেডিকেল কলেজ ঐতিহ্যগতভাবেই একটি অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছেন। কিন্তু ছাত্রশিবিরের এই আয়োজনে অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদেরও কোরবানির গরুর মাংসভিত্তিক ভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা মানসিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মামুন এই বিষয়ে জানান, ঈদের লম্বা ছুটিতে অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষার্থীই নিজেদের বাড়িতে চলে গেছেন। বর্তমানে হোস্টেলে কেবল কিছু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। এমন অবস্থায় কেবল অমুসলিম শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে রেখে ছাত্রশিবির আসলে কাদের নিয়ে এই রাজনৈতিক আয়োজন করছে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া তাদের দাওয়াত কার্ডে গরুর ছবি ব্যবহার করে অমুসলিমদের আমন্ত্রণ জানানোয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ছাত্রদলের কাছে ব্যক্তিগতভাবে আপত্তির কথা জানিয়েছেন বলেই তাঁরা কলেজ প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতারা ছাত্রদলের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলছেন, প্রতি বছরই ঈদুল আজহা উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে এমন কোরবানির আয়োজন করা হয়ে থাকে। এবারও কলেজের চতুর্থ শ্রেণির অসহায় কর্মচারী, ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং পঞ্চম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার্থীসহ যেসব শিক্ষার্থী বিশেষ প্রয়োজনে ঈদে বাড়িতে যেতে পারেননি, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে কেবল তাদের জন্যই এই উৎসবমুখর খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সনাতন বা অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও পবিত্র খাবারের বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উৎসবের সব খাবার পৃথকভাবে প্যাকেটজাত করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর কক্ষে পৌঁছে দেওয়া হবে। শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক শাহরিয়ার বলেন, ছাত্রশিবির সবসময়ই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল। একটি সুন্দর সৌহার্দ্যপূর্ণ আয়োজনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আনোয়ার হোসেন সার্বিক বিষয়ে জানান, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে এমন কোনো আয়োজনের জন্য আগে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বা লিখিত অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে শিবিরের নেতারা তাঁকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে, তারা ক্যাম্পাসের বাইরে কোরবানি সম্পন্ন করে দুস্থ মানুষের মাঝে মাংস বিতরণ করবেন, যা একটি ভালো উদ্যোগ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয় পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছেন এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ উদযাপনের স্বার্থে সবাইকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।







