একটি ফরেনসিক অডিটে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পারিবারিক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের বিপুল অর্থ নিয়ম বহির্ভূতভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অডিটে জানা গেছে।
অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) প্রত্যক্ষ প্রভাবে এসব অনুদান দেওয়া হয়। এই ১০ বছরে ২৯টি ব্যাংক থেকে মোট ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা অনুদান গেছে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল, শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এবং সূচনা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, যা ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ।
এর মধ্যে বিএবি সরাসরি সদস্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১০৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। বাকি ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা বিএবির পাঠানো অনুরোধপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো সরাসরি পরিশোধ করে। এর বাইরে অডিটররা আরও ৫৬৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন, যা একই ধরনের রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছিল।
অডিটে দেখা গেছে, ত্রাণ, বন্যা মোকাবিলা ও শিক্ষা সহায়তার নামে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলেই গেছে ১ হাজার ১১১ কোটি টাকা। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে ৩৭৪ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়, যার প্রায় অর্ধেক অর্থ ব্যয় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে। শেখ হাসিনা নিজে এই ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ছিলেন।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের প্রতিষ্ঠিত ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ পেয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। এর বাইরে বিএবির সদস্য ব্যাংকগুলোকে চাপ দিয়ে সূচনা ফাউন্ডেশনের হিসাবে আরও ৩৩ কোটি ৫ লাখ টাকা জমা করানোর অভিযোগও রয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। বাকি অর্থ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাফুফে, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ এবং বিডিআর বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্যই ১৭৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর বাইরে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ওপর নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের স্পন্সরশিপে। অডিটররা গত এক দশকে ৫৩৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক ও ‘সমর্থনহীন’ লেনদেনের তথ্যও পেয়েছেন, যেগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
নথিপত্র যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৪৭০ কোটি টাকার অনুদানের তথ্য সদস্য ব্যাংকগুলো দিলেও তার কোনো সঠিক নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এছাড়া ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার অনুদানের পক্ষে কোনো প্রাপকের স্বীকৃতি বা ব্যাংকিং নথি নেই। ৯৯ লাখ টাকার নগদ অনুদান এবং অস্তিত্বহীন সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া ৭৬ লাখ টাকার কেনাকাটার তথ্যও মিলেছে অডিটে।
একই সাথে অনুমোদন ছাড়াই ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এক খাত থেকে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি ঘটনায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তার নামে তোলা অর্থ পরে অটিস্টিক শিশুদের একটি স্কুলে দেওয়া হয়। অন্য এক ঘটনায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহায়তার কথা বলে অর্থ তোলা হলেও, তার মধ্য থেকে ১ কোটি টাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে অ্যাকাউন্ট-পেয়ি চেকের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল বলে অডিটে উঠে এসেছে।







