নিয়ম মেনে আবেদন করেও যেখানে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে অস্বাভাবিক দ্রুততায় সম্পন্ন হচ্ছে পাসপোর্টের কাজ। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে একটি রহস্যময় ‘ইমেইল সংকেত’, যা আবেদনপত্রে লেখা থাকলেই সংশ্লিষ্ট ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা মাদারীপুরের মানুষের জন্য ২০২০ সালে এই আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটির কার্যক্রম শুরু হয়। জেলার ক্রমবর্ধমান প্রবাসী জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও সময়ের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য টিনশেড দোকান গড়ে উঠেছে, যেগুলোর অনেকগুলোই দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। অফিসে প্রবেশের আগেই আবেদনকারীদের ঘিরে ধরে কাগজপত্রে সমস্যা থাকার ভয় দেখানো হয় এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আবেদনপত্রে দেওয়া বিশেষ ইমেইল বা সাংকেতিক চিহ্নই হয়ে উঠেছে দালালদের ‘পাসওয়ার্ড’। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক জানান, দালালের মাধ্যমে করা তাঁর আবেদনপত্রের নিচে একটি বিশেষ ইমেইল আইডি লিখে দেওয়া হয়েছিল এবং কোনো ঝামেলা ছাড়াই খুব অল্প সময়ে তিনি পাসপোর্ট পেয়ে যান। আবেদনপত্রে এই সংকেত থাকলে সংশ্লিষ্ট ফাইল দ্রুত অগ্রাধিকার পায় বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
রাজারচর পখিরা এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ফরাজী বলেন, তিনি নিয়ম অনুযায়ী তিনবার কাগজপত্র জমা দিলেও বারবার সমস্যা দেখানো হয়। কিন্তু পরে দালালের কাছে যাওয়ার পর আবেদনের নিচে বিশেষ কী যেন লিখে দেওয়াতেই সব কাজ হয়ে যায়। দালালের মাধ্যমে গেলে আগের ত্রুটিযুক্ত কাগজ ছাড়াই কীভাবে কাজ সম্ভব হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হোগলপাতিয়া এলাকার ইব্রাহীম সরদার অভিযোগ করেন, পাসপোর্টের সরকারি ফি ছাড়াও তাঁর কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দালাল দাবি করেন, প্রতি পাসপোর্টে তাদের হাতে থাকে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, বাকি টাকা বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দিতে হয়। তারা শুধু লোক ধরার কাজ করেন এবং এই টাকা অনেক জায়গায় ভাগ হয় বলে তারা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন সরকার ও সবুজ নামের আরেক আবেদনকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাদারীপুরে প্রবাসীর সংখ্যা বেশি হওয়ার সুযোগে দালালচক্র একটি অলিখিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং তারা এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চান।
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, কোনো দালাল অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকলে লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তবে আবেদনপত্রে বিশেষ ইমেইল বা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়টি তাঁর জানা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







