পররাষ্ট্র সচিবসহ দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে পরিবর্তন আনার প্রস্তুতি চলছে। বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে সরিয়ে নতুন পররাষ্ট্র সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীকে পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
সূত্র জানায়, জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মুহাম্মদ আবদুল মুহিতকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী পররাষ্ট্র সচিব হলে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে।
আইরিন খান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। মানবাধিকার ইস্যুতে দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি তিনি ডেইলি স্টার পত্রিকার পরামর্শক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সম্ভাব্য এসব নিয়োগ ও বদলিকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পররাষ্ট্র সচিব পদে ঘন ঘন পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও গতি ব্যাহত করছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় ও কার্যকর করার উদ্যোগ নিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনকে সরিয়ে চীনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মো. জসীম উদ্দিনকে পররাষ্ট্র সচিব করা হয়। তিনি ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে মাত্র নয় মাসের মধ্যে, ২০২৫ সালের ২৩ মে, বিশেষ পরিস্থিতিতে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর নতুন পররাষ্ট্র সচিব নিয়োগ নিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়ামকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মাত্র ছয় মাস দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২০২৫ সালের ১৯ জুন অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
সাধারণত পররাষ্ট্র সচিবের মেয়াদ তিন বছর হলেও আসাদ আলম সিয়ামকে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়ে এ ধরনের পরিবর্তন নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র সচিব এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি মিশনগুলোর নেতৃত্বে একযোগে পরিবর্তন কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কর্মরত অনেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে বিবেচনার বাইরে রেখে সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীকে পররাষ্ট্র সচিব করার চিন্তা করা হচ্ছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তিনি ১৯তম অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি তার অভিজ্ঞতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। নিউইয়র্কে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে তিনি কেবল নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে দেশে ও বিদেশে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি নতুন ও ইতিবাচক ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের কাছে সম্মানজনক অবসরে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
